নিরাপত্তা পরিষদে ধাক্কা যুক্তরাষ্ট্রের

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে নিয়ে বহু বছর ধরেই সংকটে যুক্তরাষ্ট্র। রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যে সরকারই হোক, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইরানবিরোধী অবস্থান সব সময়ই দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কারণে ইরান প্রশ্নে বেশ বেকায়দায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। ঝামেলা এতটাই প্রকট যে, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান ইস্যুতে মিত্রহারা হতে হচ্ছে।

সম্প্রতি ইরান ইস্যুতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে। গত মঙ্গলবার সংস্থাটিতে জাতিসংঘের ইরানবিরোধী নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের প্রস্তাব তোলে ওয়াশিংটন। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩টিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ায় এটি খারিজ হয়ে যায়। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি ইরান ভঙ্গ করেছে, এই অভিযোগে নতুন করে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চেয়েছিল ওয়াশিংটন। গত ২০ আগস্ট জাতিসংঘে এই প্রস্তাব দেয় ওয়াশিংটন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রস্তাবে সাড়া মিলছে না। কারণ, ট্রান্স আটলান্টিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য অন্য দেশ থেকে তেল কেনা কিছুটা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ইরানের সঙ্গে চুক্তি থাকলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তেহরান থেকে সুলভ মূল্যে তেল পাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র হিসেবে হারাতেও তারা পিছপা হচ্ছে না।

যে প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব এনেছিল, তাকে কূটনৈতিক পরিভাষায় বলা হয় স্ন্যাপব্যাক। তবে এটি উত্থাপনের পরপরই সংস্থাটির অন্য সদস্য দেশগুলো এর বিরোধিতা করে। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত ওই পরমাণু চুক্তিতে জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সও যুক্ত ছিল। এই দেশগুলোর প্রত্যেকেই নিষেধাজ্ঞা আরোপের যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। ফলে এই দেশগুলো সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে প্রস্তাবটি এমনিই খারিজ হয়ে যায়। বিশ্লেষকরা এই প্রস্তাব খারিজ হওয়ার ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন।

গত কয়েক বছরের কূটনীতিতে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বরিস জনসনের সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘে সেই বন্ধুত্বও কাজ করল না। নিরাপত্তা পরিষদের অন্য দেশগুলোর এমন অবস্থানে দৃশ্যত ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র। অস্ত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দাবি করছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অর্থ হচ্ছে সন্ত্রাসবাদীদের সমর্থন করা।

ইরানের বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা দাবিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নভেম্বরে নির্বাচনের আগে দেশের ভেতরে কিছুটা হলেও পিছিয়ে পড়েছেন ট্রাম্প। করোনায় প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করছে দেশের একটা বড় অংশ। কিন্তু বিশ্লেষকরা এও বলছেন, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। করোনার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় ইরান প্রশ্নে মিত্রহারা হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও অর্থনৈতিক চাপে পড়তে হবে। কারণ দেশটির অনেক পণ্যের বাজার ইউরোপ।

জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পকে খানিকটা পেছনে ফেলে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। এই পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদের রাস্তায় হেঁটে মানুষের সমর্থন নিজের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ সেখান থেকেই। তবে এখন নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত উল্টো বুমেরাং হয়ে গেল ট্রাম্পের জন্য।