বাঙালির ডিকশনারিতে নতুন দুটা শব্দ যোগ হয়েছে ‘গুম’ ও ‘ক্রসফায়ার’

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে পরিচালক আশফাক নিপুণ ফেসবুকে তুলে ধরেছেন নিজের বক্তব্য। আশফাক নিপুণের বক্তব্য পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

‘‘আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। আমরা সবাই মজা করে একটা কথা প্রায়ই বলি এখন। বাঙালির ডিকশনারি থেকে ‘হরতাল’ শব্দটা উঠে গেছে। শেষ কবে হরতাল দেখেছি আমরা- মনেও পড়ে না। তবে বাঙালির ডিকশনারিতে নতুন দুটা শব্দও যোগ হয়েছে। একটা হচ্ছে ‘গুম’, আরেকটা ‘ক্রসফায়ার’।

এই ‘গুম’ শব্দটা শুনলে এখন আমরা কেউই খুব একটা অবাক হই না আর। খুব স্বাভাবিকভাবে কেউ কাউকে সাবধান করার জন্যে বলি ‘দেইখো, গুম না করে ফেলে তোমাকে আবার!’ ভিন্নমত দেখলে ভাবি ‘ও গুম হয়ে যাবে নাতো?’ শুধুমাত্র ভুক্তভোগী আর তার পরিবার জানে তাদের কেউ যখন গুম হয়ে যায়, নিখোঁজ থাকে দিনের পর দিন তখন সেই পরিবারের উপর দিয়ে কি যায়, কতটা যায়! আপনি মারা গেলে পরিবার অন্তত জানতে পারবে আপনি আর নেই। কিন্তু গুম হয়ে গেলে?

দিনের পর দিন তারা অপেক্ষা করবে দরজার দিকে তাকিয়ে। বেল বাজলে পাগলের মত ছুটে যাবে, ফোন আসলে অস্থির হয়ে যাবে কোন খবর পাওয়া গেল কিনা এই আশায়। নামাজ পড়তে পড়তে বা প্রার্থনা করতে করতে কত কত অসহায় মায়ের চোখের জল যে বয়ে গেছে নদীর মতো তার গুম হয়ে যাওয়া মানিকের জন্যে, সেই হিসাব কি রাষ্ট্রের আছে? দিতে পারবে হিসাব?

আমরা যথাযথ ভাব গাম্ভীর্যের সাথে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করি প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে ডেকে, তুলে নিয়ে গুম করে দিয়েছিল দেখে অথচ সেই আমরাই নিজের দেশে যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ‘গুম’ আতঙ্কের শিকার সবচেয়ে বেশি। এর চেয়ে বড় হিপোক্রেসি, এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কি হতে পারে?

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রতিটা নাগরিকের জান মাল রক্ষা আর নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের। যারা দিনের পর দিন ধরে নিখোঁজ তারা যেন তাদের পরিবারের কাছে ফিরতে পারে, ভবিষ্যতে আর একজন মানুষও যেন এই ন্যাক্কারজনক অমানবিক ‘গুম’ এর শিকার না হোন, সে জন্যে বারবার আওয়াজ তুলতে হবে আমাদেরই। আজকে আপনি চুপ থাকবেন, কাল গুম হলে কেউ আপনার পরিবারের দিকে ঘুরেও তাকাবে না।

আল্লাহ সেই সকল পরিবারকে বেঁচে থাকার, লড়াই করার শক্তি দিন যাদের পরিবারের কেউ না কেউ গুম হয়ে গেছে। শক্তি দিন তাদের যেন তারা ফিরতে পারে তাদের বাবা মায়ের কাছে, স্ত্রী সন্তানের কাছে, ভাই বোনের কাছে, পরিবারের কাছে।’’