ভালদেরামা : কলম্বিয়ার সেরা ১০ নম্বর

কলম্বিয়ার ফুটবলকে মানুষের ড্রইং রুমে পরিচিত করেছিলেন কার্লোস ভালদেরামা। এই কথার মধ্যে কোনো অত্যুক্তি নেই। ১৯৬২তে প্রথম বিশ্বকাপ খেলার পর দ্বিতীয়বার খেলতে ২৮ বছরের অপেক্ষা করতে হয় কলম্বিয়াকে। ১৯৯০-এর বিশ্বকাপে শাপমুক্তি। আর চুরানব্বইয়ে ফেভারিটের স্বীকৃতি পেয়েছিল কলম্বিয়া।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই ফ্রান্সিসকো মাতুরানার দল লাতিন আমেরিকায় সারা ফেলেছিল ‘তিকিতাকা’ ধাঁচে ফুটবল খেলে। নিজেদের মধ্যে অসংখ্য পাস খেলে তখন আক্রমণে উঠত কলম্বিয়া। মাঝমাঠে পাসিং আর মুভিংয়ে নেতৃত্ব দিতেন ভালদেরামা। লম্বা-কোঁকড়া চুলের জাদুকর কেবল দেখতেই আকর্ষণীয় ছিলেন না, খেলতেনও মনকাড়া ফুটবল। সেই দলটার খেলা দেখে উরুগুয়ের লেখক এদোয়ার্দো গ্যালিয়ানো বলেছিলেন, ‘এরা ঘরোয়া পদ্ধতিতে ফুটবল খেলে। অনেকটা ঘরোয়া নাচের মতো। ফুটবলটাকে এরা গিটারের মতো ব্যবহার করে।’

গিটারে যেমন সুর ওঠে, ফুটবল পায়ে তেমনি ঢেউ তুলতেন ভালদেরামা। শুরুটা হয়েছিল সান্তা মার্তার রাস্তায়। ভালদেরামার বাবা ছিলেন পেশাদার ফুটবলার। অনুশীলনে নেবেন বলে ছেলেকে কথা দিয়েছিলেন। কোনো কারণে দেরি হয়। ছেলে সময় নষ্ট করেনি। বন্ধুদের সামনে বল নিয়ে জাদু দেখাতে শুরু করে। ড্রিবল করতে করতে থেমে গিয়ে আলতো টোকায় বলটা মাথায় নিয়ে হেড, এরপর হাঁটুতে কিছুক্ষণ খেলিয়ে আবার পায়ে। সবকিছু এমনই ছন্দময় আর ভারসাম্যপূর্ণ ছিল যে, সিনিয়র ভালদেরামারও অবিশ্বাস্য লেগেছিল। নিজের ক্লাবে ছেলেকে নিয়ে গেলেন। সেখানে তার এক আর্জেন্টাইন বন্ধু ছোট্ট কার্লোসের খেলা দেখে নাম দেন ‘এল পিবে’। বাংলাতে বিস্ময় বালক।

মাত্র ১৯ বছরে কলম্বিয়ার ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবলে ভালদেরামার অভিষেক। ইউনিয়ন মাগদালেনার মাঠে নাম ছড়িয়ে পড়লে জাতীয় দলে ডাক পান। ১৯৮৫ সালে কলম্বিয়ার জার্সি গায়ে অভিষেকের সময় ভালদেরামার বয়স ছিল ২৪। অভিষেকের পর বলেছিলেন, ‘এবার সুযোগ পেয়েছি। আমার জন্য এটা বিশেষ কিছু। একই সঙ্গে আমি খুশি এবং গর্বিতও। কলম্বিয়ার জার্সি গায়ে তুলব বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম।’

১৯৮৮ সালের ২৪ মে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে এক প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল কলম্বিয়া। ম্যাচটা ১-১ গোলে ড্র হয়। ইংল্যান্ডের ম্যানেজার ববি রবসন খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, ‘ইংল্যান্ডে কাউকে আমি ওভাবে খেলতে দেখিনি। ওটা ভিন্ন স্বাদের ফুটবল। সংক্ষিপ্ত এবং সুসংবদ্ধ। তিন-চারজন মিলে, কখনো আবার ওয়ান-টু-ওয়ানে, মাঝে মাঝে ট্রায়াঙ্গল তৈরি করে আক্রমণে উঠছিল। বেশ লাগছিল দেখতে। ইংলিশ ফুটবলে আপনি এমন খেলা দেখবেন না।’ তখন ক্লাব ফুটবলের শাসনভার ইতালির হাতে। আশির দশকের শেষে বাস্তেন-রাইকার্ড-গুলিত-মালদিনি-শিলাচি-বারেসিদের মতো তারকারা খেলতেন সিরি আ’তে।

ওয়েম্বলিতে আলো ছড়ানোর পর মন্টপিলিয়েরকে ফ্রেঞ্চ কাপ জিতিয়ে ইতালিতে পা রাখেন ভালদেরামা। নব্বই বিশ্বকাপ খেলার সময় তার বয়স ২৯। তার পরিণত ফুটবলের কারণেই ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই শেষ ষোলোতে পা রেখেছিল কলম্বিয়া। প্রি-কোয়ার্টারে তাদের অগ্রযাত্রা থামিয়েছিল রজার মিলার ক্যামেরুন। আসলে রেনে হিগুইতার ভুলে ছিটকে পড়েছিল কলম্বিয়া। নাপলির সেই ম্যাচটি নিয়ে ভালদেরামা বলেন, ‘দেশের এবং আমাদের প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ছিল ওটা।’

গ্রুপ পর্বে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারিয়ে, যুগোসøাভিয়ার কাছে হেরে এবং জার্মানির সঙ্গে ড্র করে প্রি-কোয়ার্টারে উঠেছিল কলম্বিয়া। এটুকু সাফল্যেই মিছিল হয়েছিল বোগোটায়। পরের বিশ্বকাপে কলম্বিয়া ছিল ফেভারিট। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরে তারা যুক্তরাষ্ট্রে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। বুয়েনস আয়ার্সে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল ৫-০ গোলে। খেলা দেখে লোকে ধরেই নিয়েছিল ভালদেরামার জন্য সোনালি মুহূর্ত অপেক্ষা করছে। বাস্তবে গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে যাওয়ার পর বন্ধু আন্দ্রেস এসকোবারের লাশ দেখতে হয়েছিল তাকে।  ১৯৬১ সালের ২ সেপ্টেম্বর সান্তা মার্তায় জন্মেছিলেন ভালদেরামা। দেশের হয়ে ১১১ ম্যাচ খেলে ১১ গোল করেছেন। নব্বই বিশ্বকাপে একমাত্র গোলটি করেছিলেন আরব আমিরাতের বিপক্ষে। তিনটি বিশ্বকাপ খেলে আর গোল পাননি। দক্ষিণ আমেরিকার বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছেন দুইবার (’৮৭, ’৯৩)। এ ছাড়া প্রায় দুই দশকের পেশাদার ক্যারিয়ারে প্রাপ্তি অনেক। সেরা কোনটা জিজ্ঞাসা করলে নির্দ্বিধায় বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারের সুখের মুহূর্ত নব্বইয়ের বিশ্বকাপ। ২৮ বছর পর আমরা যোগ্যতা অর্জন করি। লোথার ম্যাথুজ, রুডি ফোলারের জার্মানির সঙ্গে (১-১) ড্র করেছিলাম। সেটা ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতা।’

পরের দুই বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা ভালদেরামার জন্য সুখকর হয়নি। ততে অবশ্য ১০ নম্বর জার্সির মহিমা কিছু কমেছে বলে মনে হয় না। কারণ ইতিহাস জানে কলম্বিয়ার সেরা ১০ নম্বরের নাম ভালদেরামা।