যৌন নিপীড়ক শিক্ষককে বহাল রাখায় জবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে সাজা পাওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক আবদুল হালিম প্রামাণিককে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ছাত্র ইউনিয়নসহ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কয়েকটি ছাত্র সংগঠন এই প্রতিবাদী মানববন্ধনে সংহতি জানিয়েছে।

সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সামনে এ মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত শিক্ষকের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি জানান। স্থায়ীভাবে বহিষ্কার না করা হলে আরও জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার কথা জানান আয়োজকেরা।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ছাত্র ইউনিয়ন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক খায়রুল হাসান জাহিন ও কোষাধ্যক্ষ ফাতেমা মেঘলা।

জাহিন বলেন, “নিপীড়ক শিক্ষক আব্দুল হালিম প্রামাণিককে বহাল তবিয়তে রেখে নিপীড়কদের আরও হিংস্র হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে প্রশাসন। প্রথম তদন্ত কমিটির রিপোর্টে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হলে শিক্ষার্থীরা কঠোর কর্মসূচি নিতে বাধ্য হবে।”

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবদুল হালিম প্রামাণিকের বিরুদ্ধে একাধিক যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তার শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করেন। ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে ওই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে ওই শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত ও তিরস্কার করে।

এরপর ২০১৮ সালের এপ্রিলে সিন্ডিকেট সভায় তাকে তিরস্কার করে দুই বছরের জন্য তার পদোন্নতি পিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু নিপীড়নের শিকার ছাত্রী এ শাস্তিতে অসন্তুষ্ট জানিয়ে উপাচার্য বরাবর চিঠি দিলে ফের উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২তম সিন্ডিকেট সভায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় আবদুল হালিম প্রামাণিকের বিরুদ্ধে যে চারটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো হলো— সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হওয়ার জন্য চার বছরের বদলে তার আট বছর লাগবে, দ্বিতীয়ত যে দুই ছাত্রী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন তাদের কোনো ক্লাসে অভিযুক্ত শিক্ষক পাঠদান করতে পারবেন না। তৃতীয়ত ওই শিক্ষক যেসব কোর্স পড়াবেন সেসবের বাইরে আর কোনো পরীক্ষা কমিটি বা পরীক্ষার ডিউটিতেও তিনি থাকতে পারবেন না। চতুর্থত আগামী ১০ বছর চেয়ারম্যান, ডিনসহ কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে তিনি যোগ দিতে পারবেন না।

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, দুই ছাত্রীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে দীর্ঘ তদন্তের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আবদুল হালিম প্রামাণিককে চার ধরনের সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাকে শিক্ষক হিসেবে বহাল রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেহেতু তাকে দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছে। তার মানে তিনি যৌন নিপীড়ক হিসেবে প্রমাণিত। আর একজন যৌন নিপীড়ক কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র জায়গায় শিক্ষক হিসেবে বহাল থাকতে পারেন না।

চাকরি বহাল রেখে জবি প্রশাসন ওই শিক্ষককে যে শাস্তি দিয়েছে তাতে হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী দুই ছাত্রী। তাদের প্রশ্ন— এটা তো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি যৌন নিপীড়ক। যার জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শাস্তিও পেয়েছেন। যৌন নিপীড়নের অভিযোগে যিনি শাস্তি পেয়েছেন তিনি কীভাবে শিক্ষক হিসেবে বহাল থাকেন? মেয়েরা কি এ রকম একজন নিপীড়কের ক্লাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন? বিভাগে নারী সহকর্মীরা কি ওনার সঙ্গে বসে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন? নিপীড়ক শিক্ষকের ক্লাসরুমে কোনো বাবা কি পাঠাবেন তার মেয়েকে পড়ালেখা করাতে? তাহলে তাকে শিক্ষক হিসেবে কেন বহাল রাখা হলো?

তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, “শিক্ষকতা পেশার প্রথম শর্তই তো নৈতিকতা। তিনি নৈতিকতা হারিয়েছেন। নৈতিকতা হারানো একজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে বহাল রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অপরাধ প্রমাণ হওয়ার পরও তাকে শিক্ষক পদে বহাল রাখা হলে মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করবেন, প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও অভিযোগ জানাবেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী দুই ছাত্রী।