মাতৃত্বের নতুন ভূমিকা উপভোগ করছেন কাল্কি

জন্ম আধ্যাত্মিক পরিবেশে। প্রপিতামহ ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি। কিন্তু অধ্য়াত্মবাদ বা স্থাপত্য়বিদ্যা তাকে আকর্ষণ করেনি। ফরাসি বংশোদ্ভূত কাল্কি কোচিন পা রাখলেন বলিউডে। অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে অভিনয়ে ভারতের জাতীয় পুরস্কারও জয় করে নেন তিনি।

পন্ডিচেরিতে ১৯৮৪-র ১০ জানুয়ারি জন্ম কাল্কির। শ্রী অরবিন্দের আশ্রম শ্রী অরোভিলের আশ্রমিক ছিলেন তার বাবা জোয়েল কোচিন এবং মা ফ্রাঁসোয়া আর্মান্দি। কাল্কির প্রপিতামহ মরিস কোচিনের নাম জড়িয়ে আছে আইফেল টাওয়ার নির্মাণের সঙ্গে।

কাল্কির শৈশবের বড় অংশ কেটেছিল শ্রী অরোভিলে। তারপর তাদের নতুন ঠিকানা হয় তামিলনাড়ুতে উটির কাছে কল্লাত্তি গ্রাম। এখানে নতুন ব্যবসা শুরু করেন কাল্কির বাবা। 

কাল্কি যখন পনেরো বছরের কিশোরী, তার বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিয়ে করে জোয়েল চলে যান বেঙ্গালুরুতে। কাল্কিকে নিয়ে ফ্রাসোঁয়া থেকে যান পুরনো ঠিকানাতেই। আশৈশব মিশ্র সংস্কৃতির পরিবেশের জন্য ইংরেজি, ফরাসির পাশাপাশি কল্কি হিন্দিতেও সাবলিল ছিলেন।

উটির আবাসিক স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কাল্কির আগ্রহ জন্মায় লেখালেখি এবং অভিনয়ের প্রতি। তবে ছাত্রী হিসেবে তিনি ছিলেন শান্ত এবং লাজুক। স্কুলজীবন শেষে কাল্কি পাড়ি দেন লন্ডন।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি কাল্কি যুক্ত ছিলেন একটি থিয়েটার কোম্পানির সঙ্গে। অভিনয়ের হাতেখড়িও সেখানে। উইকএ্যন্ডে রেস্তরাঁয় ওয়েট্রেস হিসেবেও কাজ করতেন কাল্কি।

কোর্স শেষে ভারতে ফিরে কাল্কি প্রথমে বেঙ্গালুরু, তার পর চলে আসেন মুম্বাই শহরে। কিছু দিন থিয়েটার দুনিয়ায় কাজ করার পরে কাল্কি পা রাখেন সিনেমার জগতে। অডিশন দেন অনুরাগ কশ্যপের ‘দেব ডি’-র জন্য।

কাল্কিকে প্রথমে সুযোগ দিতে চাননি অনুরাগ। তার মনে হয়েছিল, ভারতীয় বংশোদ্ভূত না হলে ছবির সঙ্গে মানানসই হবে না। কিন্তু অডিশন টেপ দেখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন পরিচালক। বক্স অফিস সফল এই ছবিতে কাল্কির কাজ প্রশংসিত হয়।

এই ছবিটির আগে ‘লগা চুনরি মেঁ দাগ’-এ অভিনয় করেছিলেন কাল্কি। তবে তার পরিচয় তৈরি হয় ‘দেব ডি’ থেকেই। তবে ভাল অভিনয় সত্ত্বেও কাল্কির সামনে সুযোগের দরজা খুলে যায়নি। কারণ প্রধান বাধা ছিল তাঁর চেহারা।

চেহারায় পশ্চিমা প্রভাবের জন্য তথাকথিত ভারতীয় নায়িকা হিসেবে সেভাবে গ্রহণযোগ্যতা ছিল না কাল্কির। পরে তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কোনও কোনও প্রযোজক তাকে তার উঁচু দাঁতকেও ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছিলেন!

চেহারা নিয়ে কটাক্ষকে সঙ্গী করেই কাল্কি এগোচ্ছিলেন কেরিয়ারে। তাকে ‘রুশ যৌনকর্মী’ বলেও কটূক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু কাল্কি কোনওভাবেই নিজের চেহারা বা সৌন্দর্য পাল্টাতে রাজি হননি।

‘দেব ডি’ ছবির সময় ক্রমে গাঢ় হয় অনুরাগ-কাল্কি সম্পর্ক। তখন অনুরাগ বিবাহিত এবং এক কন্যাসন্তানের বাবা। নিজের ইউনিটের সম্পাদক আরতি বজাজ ছিলেন তার প্রথম স্ত্রী। আরতিকে ছেড়ে কাল্কির সঙ্গে লিভ ইন শুরু করেন অনুরাগ।

নিজের চেহারা এবং অনুরাগের সঙ্গে সম্পর্ক, এই দু’টি বিতর্কের মধ্যেই কাল্কি ক্রমে নিজের কেরিয়ার সাজিয়ে নিতে থাকেন। ‘দ্যাট গার্ল ইন ইয়েলো বুটস’, ‘শয়তান’, ‘জিন্দগী না মিলেগি দোবারা’, ‘মাই ফ্রেন্ড পিন্টো’, ‘সাংহাই’, ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’, ‘হ্যাপি এন্ডিং’, ‘মার্গারিটা উইথ এ স্ট্র’-সহ বেশ কিছু ছবিতে নিজেকে মেলে ধরেন অভিনেত্রী হিসেবে।

২০১১ সালে বিয়ে করেন অনুরাগ-কাল্কি।  দু’জনের পছন্দই ছিল অন্যধারার ছবি। ইন্ডাস্ট্রিতে তারা ছিলেন পাওয়ার কাপল। কিন্তু দাম্পত্য স্থায়ী হল মাত্র দু’ বছর। ২০১৩ সালে সেপারেশন হয়ে যায় অনুরাগ এবং কাল্কির।  এরপর ২০১৫-এ খাতায়কলমে বিচ্ছেদ হয়ে যায় অনুরাগ-কাল্কির।

ব্যক্তিগত জীবনে ঝড় উঠলেও কাল্কির কেরিয়ার টালমাটাল হয়নি। ‘ইয়ে জওয়ানি হ্য়ায় দিওয়ানি’-র সাফল্যের পরে কাল্কি ভেবেছিলেন এ বার মূলস্রোতের ছবির নায়িকা হওয়ার পথে আর বাধা থাকল না। কিন্তু তার ভাবনার সঙ্গে বাস্তবের ছবির মিল ছিল না।

অভিনয়ের প্রশংসার পরেও দীর্ঘদিন কর্মহীন ছিলেন কাল্কি। তার অভিযোগ, শুধু প্রযোজকের অশালীন প্রস্তাবে রাজি হননি বলে একটি ছবিতে অভিনয়ের কথা চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি বাদ পড়েন। 

ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন ঘটনায় কাল্কি বরাবরই সক্রিয়। ‘মি টু’ প্রসঙ্গে তিনি মুখ খুলেছেন। বলেছেন, ৯ বছর বয়সে যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন তিনি। বহু দিন এই দুঃসহ অভিজ্ঞতা কাউকে বলতে পারেননি।

কেরিয়ারে হাজারো প্রতিবন্ধকতার পরেও কাল্কি নিজের অবস্থান থেকে সরেননি। কসমেটিক সার্জারি করে নিজের চেহারা পরিবর্তন করেননি। আঁকড়ে ধরে থেকেছেন নিজের অভিনয় ক্ষমতাকেই। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘মার্গারিটা উইথ এ স্ট্র’-এর জন্য তিনি সম্মানিত হন জাতীয় পুরস্কারে।

বলিউডে বলিষ্ঠ অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম কাল্কি প্রতি ছবিতেই নিজের অভিনয় নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। নিজেকে ভেঙেচুরে তৈরি করে নেন নতুন চরিত্রের জন্য। ‘এ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ’, ‘রিবন’, ‘গালি বয়’, ‘ক্য়ান্ডি ফ্লিপ’-এর মতো ছবিতে নিজেকে মেলে ধরেছেন। টেলিভিশন এবং ওয়েব সিরিজেও নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়ধারা বজায় রেখেছেন কাল্কি।

অনুরাগ কশ্যপের সঙ্গে বিয়ে ভে‌ঙে যাওয়ার পরে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয় পিয়ানোবাদক হার্সবার্গের সঙ্গে। চলতি বছরেই মা হয়েছেন কাল্কি। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন তার কন্যাসন্তান এবং বয়ফ্রেন্ড হার্সবার্গের ছবিও। মাতৃত্বের নতুন ভূমিকা উপভোগ করছেন কাল্কি।