সালাউদ্দিনের নির্বাচনী ইশতেহার

প্রতিশ্রুতির সমাহার বাস্তবায়ন হবে তো?

ভারী আর্ট পেপারে ছাপা প্যানেল পরিচিতির মলাটে তাকাতেই চোখ আটকে গেল। বড় করে সম্মিলিত পরিষদের নেতা কাজী সালাউদ্দিনের ছবি। তার নিচে যে সবুজ মাঠ, বল আর খেলোয়াড়ের ছবি ব্যবহৃত হয়েছে, তার সবই ভিনদেশি। অথচ এই স্যুভিনিরে সালাউদ্দিন সংরক্ষণ করেছেন আগামী চার বছরে দেশের ফুটবল উন্নয়নে তার সহযাত্রীদের নাম-পরিচয়, আর ৩৬ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। স্যুভিনিরে ঠাঁই পায়নি দেশের ফুটবলার আর ফুটবল মাঠ।

গতকাল রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে প্যানেল পরিচিতির পাশাপাশি বিগত ১২ বছরে নিজেদের সাফল্যগাথা তুলে ধরেছেন সম্মিলিত পরিষদের প্রার্থীরা। যাদের হাত ধরে দেশ ফিফা র‌্যাংকিংয়ের সর্বনিম্ন (১৯৭তম) স্থানে নেমেছিল, সেই সালাউদ্দিনদের ওপর আবার আস্থা রাখতে এই ইশতেহার কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, তা ৩ অক্টোবর ভোটের লড়াইয়েই বোঝা যাবে।

গত এক যুগে দেশের ফুটবলে উদযাপন করার মতো দিন সেভাবে আসেনি। ২০০৮ সালে প্রথম মেয়াদে সভাপতি হওয়ার পর ২০১২ ও ২০১৬ নির্বাচনেও সালাউদ্দিনের ওপর আস্থা রেখেছিলেন ভোটাররা। কিন্তু এক যুগে খেলা পাঁচটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের চারটিতেই বাংলাদেশের বিদায় গ্রুপপর্ব থেকে। এক মাত্র খেলেছে সেমিফাইনাল। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটানের মতো দলের কাছে হারের লজ্জায় ডোবার বিপরীতে এক যুগের সাফল্য বলতে ২০১০ এসএ গেমসের ফুটবলে শিরোপা জয়, ২০১৮ এশিয়াডে কাতারকে হারিয়ে অলিম্পিক দলের দ্বিতীয়পর্বে খেলা আর গত বছর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভারতের সঙ্গে ১-১ ড্র। এক যুগে পেশাদার লিগের ১১টি আসর হয়েছে ১১টি ফরম্যাটে। কখনো শীতে, কখনো গ্রীষ্মে, আবার কখনো লিগ হয়েছে ভরা বর্ষায়। কখনো এক ভেন্যু আবার কখনো বহু ভেন্যুতে। বিদেশি কোটাও পাল্টে গেছে বছর বছর। ২০১২ নির্বাচনে জয়ের পর একটা পঞ্জিকা তারা প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু সেটা মেনে চলেনি ঘরোয়া ফুটবল। কোনো নির্দিষ্ট ছকে হয়নি খেলা। ২০০৮ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় সালাউদ্দিনের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল দু’টি। প্রথমটা ঢাকার ফুটবল নিয়মিত করা। দ্বিতীয়টা জেলা ফুটবলের স্থবিরতা কাটানো। ১২ বছরে ঢাকার ফুটবল কোনোমতে চললেও একই তিমিরে রয়ে গেছে জেলার ফুটবল। তাই ফুটবলার সংকট পৌঁছেছে চরমে। ১২ বছরে একজন সুপারস্টার তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন সালাউদ্দিন। ২০১৬ সালে যে ২৫ দফা ইশতেহার দিয়েছিলেন, তার একটাও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি তার নেতৃত্বাধীন কমিটি। এবার তারা দিয়েছেন ৩৬ দফা। যেখানে নতুনত্ব বলতে নেই তেমন কিছুই।

ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ১৮৭-তে থাকা জাতীয় দলের উন্নয়নে গাল ভরা প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবারও। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ নিয়মিত আয়োজন, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ও এসএ গেমসের শিরোপা পুনরুদ্ধার ও ফিফা র‌্যাংকিংয়ে উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। ঘরোয়া ফুটবল সুনির্দিষ্ট পঞ্জিকা মেনে করা, নির্দিষ্ট সময়ে দলবদল, জেলা ফুটবল লিগ নিয়মিত আয়োজন, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগ লিগ, পাইওনিয়ার লিগ নিয়মিত আয়োজন ও ক্লাবগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ৬ বছর বিরতি দিয়ে শুরু হওয়া মেয়েদের লিগ ধারাবাহিক আয়োজন, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ও এসএ গেমসে শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে মেয়েদের ফুটবল নিয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে। সরকারের সহায়তায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্টেডিয়াম বৃদ্ধি করা। দেশে কমপক্ষে চারটি স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ভেন্যুতে রূপান্তর, টার্ফ পুনঃস্থাপন, বাফুফে ভবনে মহিলা দলের আবাসন চার তারকা মানে উন্নীতকরণ, বাফুফে ভবনে মিডিয়া সেন্টার, কাউন্সিলরদের জন্য কক্ষ ও জিমন্যাসিয়াম তৈরির উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি আছে ইশতেহারে। যদিও এই প্রতিশ্রুতিগুলো অতীতের সবক’টি নির্বাচনের আগে শোনা গেছে তাদের মুখে। নতুনের মধ্যে- প্রতিটি বিভাগে বাফুফে টেকনিক্যাল সেন্টার তৈরি, জেলায় জেলায় ফুটবল ফ্যাস্টিভাল নিয়মিত আয়োজন, বঙ্গবন্ধু জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ, শেখ কামাল অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, শেখ রাসেল অনূর্ধ্ব-১০ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সম্মিলিত পরিষদ।

ইশতেহার পাঠে অবশ্য ছিল নতুনত্ব। পাঁচটি পৃথক প্রস্তাব পাঠ করেছেন এই প্যানেলের ৬ জন প্রার্থী। জাতীয় দল নিয়ে বলেছেন এতদিন এই কমিটির দায়িত্ব পালন করা সহ-সভাপতি কাজী নাবিল। ঘরোয়া ফুটবল নিয়ে পরিকল্পনা জানিয়েছেন বর্ষীয়ান সংগঠক ও সদস্য প্রার্থী হারুনুর রশীদ। মহিলা ফুটবল নিয়ে বলেছেন মাহফুজা আক্তার কিরণ। উন্নয়ন প্রকল্প ও কারিগরি পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন তিন সহ-সভাপতি প্রার্থী আতাউর রহমান ভুইয়া মানিক, আমিরুল ইসলাম বাবু এবং ইমরুল হাসান। ২১-সদস্যের প্যানেল পরিচয় করিয়ে দেন সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রার্থী সালাম মুর্শেদী।