‘স্পিন কিং’ বেদি যেন স্বর্গোদ্যানের বোলার

বিষেন সিং বেদি সম্পর্কে সুনীল গাভাস্কারের উক্তি, ‘সে আমার দেখা গ্রেটেস্ট লেফট আর্ম বোলার।’ এই প্রশংসার মধ্যে একটুও খাদ মেশানো নেই, কারণ দুজনের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। বেদি যেকোনো প্রসঙ্গে গাভাস্কারের সমালোচনা না করে এক ফোঁটা হুইস্কিও মুখে তুলতেন না। টাইমসে পাঠানো খোলা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমি যেকোনো দিন তোমার সঙ্গে একই দলে খেলেছি তা ভাবতেও লজ্জাবোধ করছি।’ ‘স্পিন কিং’ এখনো তেমনই ঠোঁটকাটা।

এবার জিম লেকারের বক্তব্য শোনা যাক। কিংবদন্তি ইংলিশ অফস্পিনার লিখেছিলেন, ‘স্বর্গে যদি ক্রিকেট মাঠ থাকে তো তাতে বোলিং করবেন একদিকে অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার রে লিন্ডওয়াল, অন্যদিকে বিষেন সিং বেদি। এ দুজনের অ্যাকশনে যে সৌষ্ঠব, লাবণ্য ও ছন্দ আছে তা অন্য কারও মধ্যে নেই।’

বেদি ছিলেন ক্ল্যাসিক অ্যাকশনের বোলার। হাতটা বাঁ কানের পাশ দিয়ে এমনভাবে নামত যে মনে হতো ‘টুয়েলভ-ও-ক্লক’ ডেলিভারি করছেন। অসাধারণ ফ্লাইট করাতে পারতেন। ১৯৭১-এ ‘অস্ট্রেলিয়া বনাম রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ সিরিজের একটি টেস্ট হয়েছিল সিডনিতে। সেখানে বেদি পরপর ফ্লাইট করিয়ে ইয়ান ও গ্রেগ চ্যাপেলকে আউট করেন। যা দেখে গ্যারি সোবার্স বলেন, ‘অসাধারণ ফ্লাইটের চাতুরী তো ছিলই। বেদি ইচ্ছেমতো বল দেরিতেও ছাড়তে পারতেন।’

বেদি প্রথম নজরে আসেন ১৯৬৬-তে। ভারত সফরে এসেছিল উইন্ডিজ। বোর্ড প্রেসিডেন্ট একাদশের হয়ে গ্যারি সোবার্সের সেই দলের বিপক্ষে খেলতে নেমেছিলেন বেদি। পারফরম্যান্সেও মন জিতেছিলেন। বিশেষ বিবেচনায় তাকে চৌদ্দজনের টেস্ট দলে নেওয়া হয়েছিল মূলত নেটে বল করার জন্য। অধিনায়ক টাইগার পতৌদি তাকে নেটে দেখেই কলকাতা টেস্টের দলে নেন। অভিষেকে ৩৬ ওভার বল করে ৯২ রানে বুচার ও ক্লাইভ লয়েডের উইকেট নিয়েছিলেন বেদি। ইডেনের একমাত্র ইনিংসে ৩৯০ করেছিল উইন্ডিজ। দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে নেওয়ার সুযোগ পাননি সর্দারজি। কিন্তু প্রথম ইনিংসে তিনি যে লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা দেখেই মাদ্রাজ টেস্টে (এখন চেন্নাই) পতৌদি আবার তাকে দলে নেন। এবার অধিনায়কের আস্থার প্রতিদান দিতে ভুল করেননি বেদি। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮ ওভার বল করে ৮২ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন। যেমন তেমন উইকেট নয়, আউট করেছিলেন বাইনো, কানহাই, লয়েড ও নার্সকে। মাদ্রাজ টেস্ট ভারত জিততেও পারত যদি বেদির বলে রুর্সি সুর্তি শর্ট লেগে দাঁড়িয়ে সোবার্সের দেওয়া ক্যাচটা নিতে পারতেন। ৭৪ রানে অপরাজিত ছিলেন ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক। চার্লি গ্রিফিথকে নিয়ে অবিচ্ছিন্ন অষ্টম উইকেটে ৭৭ রান তুলে ড্র নিশ্চিত করেছিলেন।

মাদ্রাজ টেস্ট থেকেই শুরু হয় ভারতীয় স্পিনের স্বর্ণযুগ। ভেংকটরমণ সুব্রামনিয়ম যদিও উইকেট পাননি। উইন্ডিজের ১৭ উইকেটের ১৪টিই নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন বেদি, প্রসন্ন আর ভাগবত চন্দ্রশেখর। এরপর ইংল্যান্ড সফরে তিন টেস্টে ৭ উইকেট নেন বেদি। ১৬ উইকেট নেন চন্দ্রশেখর আর ৯ উইকেট নিয়েছিলেন প্রসন্ন। আটষট্টিতে দুই টেস্ট খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিল ভারত। সেই সফরে বেদি মাত্র ৪ উইকেট নেন। মাঠের ব্যর্থতা তিনি উসুল করেছিলেন বিয়ে করে। ওই সফরেই অস্ট্রেলীয় স্ত্রীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন বেদি।

বিয়ের পর নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরে-বাইরে টানা ৭ টেস্ট খেলে সর্দার নেন ৩১ উইকেট। সম্ভবত তিনি তখন ফর্মের মধ্যগগনে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধেও সেই ফর্ম অব্যাহত ছিল। ঘরের মাঠে বিল লরির দলের বিরুদ্ধে পাঁচ টেস্টে ২১ উইকেট নিয়েছিলেন বেদি।

মাঠে চিরকাল ব্যাটসম্যানকে চ্যালেঞ্জ জানাতেন। ফ্লাইট দিয়ে মারতে প্রলুব্ধ করতেন। চার-ছয় খেলেও ফ্লাইট করানো বন্ধ করতেন না। যে কারণে ওয়ানডেতে সফল হননি। মাত্র ১০ ম্যাচে ৪৮.৫৭ গড়ে ৩৪০ রান দিয়ে ৭ উইকেট নিয়েছিলেন। ওয়ানডেতে তার একমাত্র সাফল্য ইস্ট আফ্রিকার বিরুদ্ধে। পঁচাত্তরের বিশ্বকাপে যাদের বিপক্ষে বেদির বোলিং বিশ্লেষণ ১২-৮-৬-১।

একাত্তর থেকে চুয়াত্তরের মধ্যে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১০ টেস্টে ভারতের হয়ে ৪৬ উইকেট নিয়েছিলেন বেদি। এটা দেখে ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে, কেবল ইংলিশ ব্যাটসম্যানদেরই তিনি ভোগাতেন। নিউজিল্যান্ড, উইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তানÑ এই চার দেশের সেরা ব্যাটসম্যানদের কাছেও বেদি ছিলেন আতঙ্ক। অ্যাকশনের কারণে তার আর্ম বল বোঝা যেত না। ফ্লাইট আসত অনুমানের চেয়ে ধীর গতিতে। ৬৭ টেস্টে ২১৩৬৪ বল করে বেদি নিয়েছেন ২৬৬ উইকেট। ফার্স্ট ক্লাসে তার উইকেটসংখ্যা ১৫৬০।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কুম্বলে-হরভজন-অশ্বিনরা তাকে উইকেটের দৌড়ে পেছনে ফেললেও প্রথম শ্রেণিতে চিরকাল এগিয়ে সর্দারজি। আরও একটা ক্ষেত্রে কেউ চেষ্টা করেও তাকে পেছনে ফেলতে পারবে না। বিষেন সিং বেদি হলেন চিরন্তন ঠোঁটকাটা স্বভাবের। গাভাস্কারকেও তিনি ছেড়ে কথা বলেন না। একবার মুরালিধরনকে বলেছিলেন ‘জ্যাভলিন থ্রোয়ার’। আটাত্তরে পাকিস্তান সফরে আম্পায়ারের ওপর ক্ষেপে দল তুলে নিয়েছিলেন। ইমরানের হাতে ছক্কা খাওয়ার পর ‘সর্দারজি, কেমন লাগে?’ বলে ক্ষেপানোতে দর্শকদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেছিলেন ‘হারামজাদা, তোদের জন্য মার্শাল ল-ই ঠিক আছে!’