রাজধানীর ডেমরায় বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত মাতুয়াইল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র। ভবনের প্রতিটি দেয়ালে ফাটল ও শেওলা, খসে পড়েছে ছাদের পলেস্তারাসহ বড় বড় অংশ, প্রাঙ্গণে ময়লার স্তূপ, জমে আছে পানি, এমনকি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নামের সাইনবোর্ডও ভেঙে ঝুলে পড়ে আছে। ফলে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। এলাকাবাসী সপ্তাহে বুধবার সেবা নেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে কাঠের আসবাব বানানোর একটি দোকানে। প্রতিষ্ঠানটির উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার শিল্পী রানী বলছেন, এত সমস্যার পরও তারা নিয়মিত মা ও শিশু সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের এই বেহাল দশা গত পাঁচ বছরের। বৃষ্টি হলে সপ্তাহের ওই এক দিন বুধবারও সেবা বন্ধ থাকে। আর খরায় রাস্তায় দীর্ঘ সিরিয়াল ধরে নাভিশ্বাস রোগীদের।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আর কোনো সংস্কার করা হয়নি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের। মা ও শিশুর যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। পরিবার পরিকল্পনা সেবা, বয়ঃসন্ধিকালীন সেবা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে শিক্ষামূলক সেবা ও পরামর্শ প্রদানের মতো আরও অনেক সেবা অবকাঠামোর অভাবে সঠিকভাবে পাচ্ছেন না বলে জানান স্থানীয়রা।
এলাকাবাসী জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে নারীদের দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিসহ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণকেন্দ্রিক অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসেবা বন্ধ রয়েছে। আগে বিনা মূল্যে গর্ভবতীসেবা, প্রসবসেবা, গর্ভোত্তরসেবা, এমআর সেবা, নবজাতকের সেবা, শূন্য থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুদের সেবা, প্রজননতন্ত্রের বা যৌনবাহিত রোগের সেবা, ভিটামিন-এ ক্যাপসুল বিতরণসহ নানা সেবা দেওয়া হতো। যার অধিকাংশই এখন বন্ধ। কেন্দ্রটিতে পরিবার পরিকল্পনা সেবা, বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক পরামর্শ প্রদান, খাবার বড়ি, জন্মনিরোধক ইনজেকশন, আইইউডি বা কপারটি, ইমপ্ল্যান্ট, লাইগেশন বা টিউবেকটমি (মহিলাদের স্থায়ী পদ্ধতি), পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ বা ব্যবহারজনিত পাশর্^প্রতিক্রিয়া জটিলতার সেবা দেওয়া হতো। অথচ জলাবদ্ধতা, নজরদারি ও নতুন ভবনের অভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে এখন আর এ ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া সাধারণ চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
গত বুধবার রাবেয়া বসরী নামে এক নারী বাচ্চা নিয়ে আসেন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে। তিনি বলেন, ‘বাড়ির কাছে একটি এনজিও বাচ্চাদের টিকা দিতে আসে। তাদের প্রথমবার ৩০০ টাকা দিতে হয়। ঘরে খাবার থাকে না। এত টাকা টিকার জন্য কীভাবে দেব? তাই এখানে বিনা মূল্যে সেবা নিতে আসি। কিন্তু এখানে রাস্তায় সিরিয়াল ধরতে হয়। অন্যের দোকানে বসে আপারা সেবা দেন। আবার টিকা দেবে নাকি আরেক জায়গায়। অনেক দিন হয় সব সেবা ঠিকভাবে পাই না।’ মুর্শেদা বেগম নামে আরেক রোগী বলেন, ‘বৃষ্টি এলে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। রোদেও খারাপ অবস্থা। এভাবে চিকিৎসা নেওয়া যায় না। দালান ঠিক করবে করবে অনেক দিন ধরে শুনতেছি, কাজের কাজ কিছুই দেখছি না।’
কাঠের আসবাবের দোকানের কর্মচারী বিল্লাল বলেন, ‘উপায় না দেখে আমাদের দোকানে বসে আপারা চিকিৎসা দেন। অসুবিধা হয় আমাদের। কিন্তু কিছুই তো বলার নেই। ভবন তো ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে পাঁচ বছর হবে। দেখার কেউ নেই।’
মাতুয়াইল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার শিল্পী রানী বলেন, আমরা রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও বিনা মূল্যে ওষুধ দিই। ডায়াবেটিস পরীক্ষা, ওজন ও রক্তচাপ মাপা, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করি। গভর্বতী মাকে নিয়মিত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু অবকাঠামো না থাকায় ঠিকভাবে সেবা প্রদান করা সম্ভব হয় না।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৬৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল মতিন সাউদ বলেন, বর্তমানে কাউন্সিলর অফিসে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছি আমি। আমাদের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে মিটিংয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিয়ে কথা বলেছি। আশা করছি, দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু হবে।