গ্রাহককে অবহিতকরণ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি মোবাইল কোম্পানি থেকে কল রেকর্ড বা কললিস্ট সংগ্রহ অবশ্যই বন্ধ করা উচিত বলে অভিমত দিয়েছে উচ্চ আদালত।
একই সঙ্গে ডিজিটাল ডকুমেন্টকে সাক্ষ্য হিসেবে নিতে সাক্ষ্য আইন সংশোধন করতে মতামত দিয়েছে হাইকোর্ট। শিশু সৈকত হত্যা মামলায় আসামির ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে এমন অভিমত এসেছে।
বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি এ এস এম আব্দুল মোবিনের সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তর বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়টি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৪৯ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে ২০১৯ সালে রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি অলি আহম্মদ হাইকোর্টের রায়ে খালাস পান। আসামি অলির পক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
আইনজীবীরা জানান, শিশু সৈকতকে (৭) হত্যায় নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানায় ২০১০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলা করেন সৈকতের বাবা মো. সিদ্দিকুর রহমান। ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর প্রধান আসামি নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ছাত্র অলি আহম্মদকে (২২) মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪।
একই সঙ্গে পলাতক আসামি সবুজ মিয়া ও তাপস সাহার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক শিশুকে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয় একই আদালত। আইন অনুযায়ী শিশুর অপরাধের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হতে পারে কি-না, এ নিয়ে আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে হাইকোর্টে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয়।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, ‘এটি সাধারণ অভিজ্ঞতা যে, আজকাল নাগরিকদের মধ্যে ব্যক্তিগত অডিও-ভিডিওসহ ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয়গুলো প্রায়ই বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় এবং প্রকাশিত হয়। সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে নাগরিকদের চিঠিপত্রের এবং যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ে গোপনীয়তার অধিকারের নিশ্চয়তা অবশ্যই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।’
এতে আরও বলা হয়, ‘রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এবং বাংলাদেশে পরিচালিত ফোন সংস্থাগুলোর একটি বৃহৎ দায়িত্ব রয়েছে। সংবিধানের সঙ্গে যায় না এমন আইনের অনুমতি না থাকলে তারা (মোবাইল কোম্পানিগুলো) তাদের গ্রাহক ও দেশের নাগরিকদের যোগাযোগ সম্পর্কিত কোনো তথ্য কাউকে সরবরাহ করতে পারে না।’
রায়ে বলা হয়েছে, ‘কারও যোগাযোগের তথ্য সম্পর্কিত কল লিস্ট এবং তথ্যের জন্য কোনো মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সংস্থা/ অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাতে হবে। অন্যথায় সরবরাহ করা দস্তাবেজটি তার স্পষ্টতার মূল্য হারাবে এবং সরবরাহকারী ব্যক্তি /কর্তৃত্ব সংবিধানের আওতাধীন গ্যারান্টিযুক্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের পক্ষেও দায়বদ্ধ হবে।’
রায়ে হাইকোর্ট আরো বলে, ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ আইন সংশোধন না করা বা ডিজিটাল ডকুমেন্টকে প্রমাণ হিসেবে আইন করা না হলে কোনো ব্যক্তির কললিস্ট এবং টেলিফোন কথোপকথনের কোনো স্পষ্ট মূল্য থাকতে পারে না।’
রায়ে প্রত্যাশা করা হয়, সাক্ষ্য আইন সংশোধন করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। হাইকোর্ট বলেন, ‘এটি সময়ের দাবি যে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ এবং বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহারের কারণে, আইনটি সংশোধন বা উন্নততর হওয়া উচিত।’
অলির আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মামলায় উচ্চ আদালত অলির কল তালিকা তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ সেগুলো বেসরকারি মোবাইল অপারেটর সংস্থা কর্তৃক অথরাইজড করা ছিল না বা যারা সংগ্রহ করেছে তাদের স্বাক্ষরও ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের এই রায়টি যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে যেসব বিষয়ে আলোকপাত করেছেন আমাদের প্রত্যাশা রাষ্ট্র এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ আমলে এগুলো বাস্তবায়ন করবেন।’