আখাউড়ায় নার্সের বিরুদ্ধে নবজাতক শিশু হত্যার অভিযোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় সিনিয়র স্টাফ নার্স ঝর্না বেগমের বিরুদ্ধে নবজাতক শিশু হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির তদন্ত শেষে নার্সের গাফিলতির বিভিন্ন অনিয়ম খুঁজে পায়। দীর্ঘদিন ধরে ঝর্না বেগম টাকার লোভে তার সরকারি কোয়ার্টারে অবৈধ গর্ভপাত ও অবৈধ পন্থায় নরমাল ডেলিভারির নাম করে বাচ্চা প্রসব করিয়ে আসছে। এতে ঝর্না বেগম হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা।

জানা গেছে, চলতি বছরের ২৬ মার্চ দুপুরে প্রসব ব্যথা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝর্নার কাছে আসেন টনকী সাদেকুল উলুম আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন শুভর স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার জ্যোতি। ঝর্ণা তার বাসায় নিয়ে আসেন জ্যোতিকে। তার অবস্থা দেখে নরমাল ডেলিভারির আশ্বাস দেন এবং তাদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকার রফাদফা করেন ঝর্ণা। পরবর্তীতে বাচ্চা প্রসব করানোর সময় ঝর্না তার সহযোগীদের নিয়ে রোগীর পেটে চাপ প্রয়োগ করার সময় রোগীর অবস্থা বেগতিক দেখে রোগীর মা লুৎফা বেগম ঝর্ণাকে বলেন অন্য জায়গায় রোগীকে নিয়ে যায়। কিন্তু তাতে রাজি হয়নি ঝর্না বেগম। পরবর্তীতে রোগীর জরায়ুর মুখে কাটা ছেঁড়া করে বাচ্চা প্রস্রাব করায়। পরবর্তীতে বাচ্চার শ্বাস কষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিলে রোগীর স্বজনরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া গ্রিন ভিউ হাসপাতালে ভর্তি করান। ওই দিন রাতেই নবজাতক শিশুটি মারা যায়। পরে জ্যোতিরও অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ নিয়ে নবজাতকের বাবা চলতি বছরের ৩১ মার্চ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বরাবরে অভিযোগ দেয় নার্স ঝর্না বেগমের বিরুদ্ধে। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ এপ্রিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডাঃ শুভ্র রায়কে প্রধান করে ৬ সদস্যদের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি গঠন করার দীর্ঘ চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও কোন ন্যায্য বিচার না পাওয়ায় নবজাতকের বাবা কাজী দেলোয়ার হোসেন শুভ ১৬ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন।

আদালতে ওই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ১৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়। আদালত আসামি ঝর্না বেগমের বিরুদ্ধে ২৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

মামলার বাদী কাজী দেলোয়ার হোসেনে শুভ জানান, আমার স্ত্রীর প্রসব যন্ত্রণার ব্যথা উঠলে আখাউড়া উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সিনিয়র স্টাফ নার্স ঝর্না বেগম নরমাল ডেলিভারি করার কথা বলে সরকারি কোয়ার্টার তার বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে আমার স্ত্রীর পেটে চাপ প্রয়োগ করে জরায়ুর মুখে কাটা ছেঁড়া করে প্রসব করায়, বাচ্চার মাথায় আঘাত পায়। বাচ্চার অবস্থা খারাপ হওয়ায় কয়েক ঘণ্টা পর বাচ্চা ও তার মা কে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্রিন ভিউ হাসপাতালে নিলে সেখানে রাতেই আমার নবজাতক শিশুটি মারা যায়।

এ বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স ঝর্না বেগম বলেন, রোগী এবং মায়ের অনুরোধ আমি নরমাল ডেলিভারি করার চেষ্টা করি এবং ডেলিভারি হয়। তখন বাচ্চা এবং মায়ের অবস্থা খারাপ দেখে সদর হাসপাতালে রেফার করি। এতে আমার কোন গাফিলতি ছিল না।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. শুভ্র রায় বলেন, সিনিয়র স্টাফ নার্স ঝর্না বেগমের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করা হয়েছে তার সত্যতা পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, শুনেছি ঝর্না তার সরকারি বাসায় অবৈধ গর্ভপাত ও নরমাল ডেলিভারি করান। এ বিষয়ে তাকে সতর্ক করা হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান বলেন, সিনিয়র স্টাফ নার্স ঝর্না বেগমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। সেই প্রতিবেদন আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

আখাউড়া থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রসুল আহমদ নিজামী বলেন, ঝর্নার নামে আদালতের ওয়ারেন্ট পেয়েছি।  তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।