উত্তরপ্রদেশের হাথরসে ধর্ষণে দলিত তরুণীর মৃত্যুর ঘটনায় গোটা ভারত তখন ক্ষুব্ধ। এর মধ্য পরিবারকে ঘরবন্দী করে রাতের অন্ধকারে ওই তরুণীর মরদেহ সৎকার করে পুলিশ।
টানা ১৪ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত মঙ্গলবার হার মানেন ধর্ষিতা নারী। উচ্চবর্ণ ব্যক্তিদের ধর্ষণে মৃত্যু এরপর পুলিশের এমন অমানবিক কর্মকাণ্ডে ক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশটির মানুষ।
দলিত তরুণীকে সৎকারের সেই দৃশ্য তুলে এনেছিলেন ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র সাংবাদিক তনুশ্রী পান্ডে এবং তার ক্যামেরাপারসন ওয়াকার আহমেদ।
পড়ুন: ভারতে ধর্ষণে মৃত্যু: পরিবারকে তালাবন্ধ রেখে সৎকার পুলিশের
সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, গভীর রাতে ধর্ষিতার দেহ কাঠের অগোছালো চিতায় চড়িয়ে হারিকেন থেকে কেরোসিন ঢেলে দেশলাই জ্বালিয়ে সেটা পুড়িয়ে দিচ্ছে যোগী প্রশাসনের পুলিশ।
ভিডিও করতে করতেই তনুশ্রী টুইট করেছিলেন, ‘অবিশ্বাস্য! আমার ঠিক পেছনেই হাথরাস মামলার মৃত তরুণীর দেহ পুড়ছে। পুলিশ তার পরিবারকে ঘরে আটক করে রেখেছে। আর সকলের অগোচরে লাশ পোড়াচ্ছে।’
তনুশ্রীর সাহসিকতায় গোটা ভারত জেনে যায় ধর্ষিতা ও তার পরিবারের প্রতি পুলিশের এমন অন্যায় আচরণ। সেই ভিডিও এখন পর্যন্ত সেই দৃশ্য দেখেছেন ৩৩ লাখের বেশি মানুষ।
এরপর বৃহস্পতিবার হাথরসে দেখা গেল আরেক সাহসী নারী সাংবাদিককে। কংগ্রেসের দুই নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে ওই গ্রামে ঢুকতে দেয়া না হলেও সেখানে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন তরুণী প্রতিমা মিশ্র।
পড়ুন: ভারতে ‘উঁচুজাত’ ধর্ষকদের বাঁচাতে বিজেপি নেতার সমাবেশ
কখনো ব্যারিকেডের সামনেই বসে পড়ছেন। আবার পুলিশের মুখে ঠুসে ধরছেন চ্যানেলের বুম। ক্রমাগত পুলিশকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন। পুলিশ যখন বলছে, তাকে ধর্ষিতার গ্রামে ঢুকতে দেবে না, এভিপি নিউজের এই সাংবাদিক তখন গলা চড়িয়ে বলছেন, ‘অর্ডার কোথায়? গ্রামে ঢুকতে না দেওয়ার অর্ডার কোথায়? অর্ডার! অর্ডার! অর্ডার! অর্ডার! অর্ডার! অর্ডার! অর্ডার!’
পড়ুন: যোগীর রাজ্যে রাহুলকে ‘গলাধাক্কা’, পরে আটক
তার প্রশ্নে নাজেহাল হয়ে পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিমার ক্যামেরার লাইভ ফিডের তার ধরে টান মারেন। তারপর নারী পুলিশ ডাকেন। দেখা যায়, প্রতিমাকে চালের বস্তার মতো তুলে দিচ্ছেন পুলিশের গাড়িতে।
গ্রাম ছাড়িয়ে পাকা রাস্তায় তোলার পরেও তিনি মাইক্রোফোন বাড়িয়ে দিচ্ছেন সামনের সিটে বসে থাকা নারী অফিসারের দিকে। বলছেন, ‘খুব পরিশ্রম হলো। না? দেখুন, দেখুন। রুমাল বার করে ঘাম মুছছেন উনি এখন!’ তারপর সহযোগী ক্যামেরাপারসন মনোজকে, ‘ক্যামেরা বন্ধ করবে না একদম!’
টানা আধঘণ্টার সেই টানাপোড়েনের দৃশ্য এখনো পর্যন্ত দেখেছেন ৫৪ লাখের মতো মানুষ।
এ দুই নারীর এমন বীরোচিত কর্মকাণ্ড দেখে প্রবীণ সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত বলেন, ‘এগুলোই হচ্ছে সাংবাদিকতার নিদর্শন। এই হামাগুড়ি দেওয়ার সময় দুই টি বাচ্চা মেয়ে যে সাহস আর দক্ষতা দেখাল, সেটা অভাবনীয়। ওদের দু’জনকেই স্যালুট।’
পড়ুন: উত্তরপ্রদেশে দলবদ্ধ ধর্ষণে আরও এক দলিত নারীর মৃত্যু
অশোক আরও বলছেন, ‘এরাই তো ইস্যুটা দিল রাজনীতিকদের। যেখানে রাহুলকে যেতে দিল না যোগীর পুলিশ, এরা সেখানে পৌঁছল। শুধু পৌঁছল না। খুঁড়ে বার করে আনল। উত্তরপ্রদেশ সরকার যে কিছুটা হলেও পিছু হটে সিবিআই তদন্তের সিদ্ধান্ত নিল, তাতে তো এদেরই সবচেয়ে বড় ভূমিকা থেকে গেল।’
দিল্লির সিনিয়র সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল ‘এমন ঘটনা আমি এর আগে কখনও দেখিনি। সম্ভবত এখন সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তার ফলেই আমাদের পেশার কোথাও কোথাও এই আগ্রাসন বা এই বিদ্রোহ জন্ম নিচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের হিন্দি বলয়ে এমনিতেই সাংবাদিকতা করা কঠিন। সেখানে দু’টি নেহাতই বাচ্চা মেয়ে যে সাহস দেখিয়েছে, তেমনটা আমি অন্তত আমার ৩৫ বছরের সাংবাদিক জীবনে কখনও দেখিনি।’
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা
পড়ুন: ভারতে দিনে ৮৭ ধর্ষণ!