মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ধর্ষণের কারণ

বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও গতকাল শনিবার পালিত হয়েছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। ‘সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য : অধিক বিনিয়োগ, অবাধ সুযোগ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সভা-সেমিনার করেছে নানা সংগঠন। বক্তারা বলছেন, দেশের ৯২ শতাংশ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে। সম্মিলিত উদ্যোগে এ সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব। হয়রানি, হতাশা এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা স্থিতিশীল না থাকায় বিষণœতার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে দেশজুড়ে বাড়তে থাকা ধর্ষণের পেছনে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি অন্যতম প্রধান একটি কারণ বলে মনে করছেন তারা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. দেওয়ান আবদুর রহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কখনো রেপ করে না। এটা অবশ্যই সাইকোলজিক্যাল ডিস অর্ডার এবং যে ধর্ষণ করে সে নিঃসন্দেহে একজন মেন্টাল পেশেন্ট। তবে এ ধরনের রোগীকে সাধারণ মানুষের পক্ষে চেনা সহজ নয়।’

এর সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর কামালউদ্দিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষের জন্ম থেকে বড় হওয়া, থাকার পরিবেশ, তার সঙ্গী কেমন, মাদক গ্রহণসহ অনেক কারণে এই অসুস্থতা বা বিকৃতি তৈরি হয়।’

ধর্ষণ কোনোভাবেই যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত না উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা নিত্রা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা ক্ষমতা প্রদর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। নারীকে যে সমাজ ভোগ্যপণ্য বা সম্পত্তি হিসেবে নির্মাণ করে সেই সমাজে পুরুষ যারা বেড়ে ওঠে তারা নারীকে ঐভাবেই দেখতে শেখে।’

ধর্ষণের মানসিকতা সৃষ্টি হওয়ার প্রসঙ্গে সামিনা লুৎফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরুষ যখন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চায় তখন নারী যদি মানা করে তাহলে পুরুষ সেটা নিজের অহমের ওপর আঘাত বলে মনে করে এবং নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার এই ধারণা থেকে পুরুষ ধর্ষক হয়ে ওঠে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ষণটা কিন্তু নারীকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যে আমি তোমার থেকে ক্ষমতাবান সুতরাং আমার কথা মতো তোমাকে চলতে হবে, ইউ হ্যাভ টু বি আন্ডার মাই কন্ট্রোল। ধর্ষক তৈরি করার ক্ষেত্রে সমাজ এই ভূমিকাটা রাখে। একজন মানুষ নারীকে কীভাবে দেখে সেই শিক্ষা তিনি পরিবার, স্কুল-কলেজ, গণমাধ্যম মানে সমাজ থেকেই পান। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে অধস্তন বা ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা হয়।’

একই বিভাগের শিক্ষক ড. দেবাশিষ কুণ্ড দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধর্ষণের মাধ্যমে ধর্ষক কিছু প্রমাণ করতে চায়, কিছু হাসিল করতে চায় বা কাউকে কিছু দেখিয়ে দিতে চায় অথবা স্রেফ কারও সম্মানহানি করতে চায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে ধর্ষককে তার পরিচয় যেমন রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় দিক ইত্যাদি থেকে আলাদা করে ফেলার একটা চেষ্টা হচ্ছে কিন্তু বিশ্বের কোথাও একজনকে তার পরিচয় থেকে আলাদা করে নেওয়া হয় না।

মানসিক বিকৃতির ফলে ধর্ষণ বাড়ছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা আর্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. রুমানা হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবশ্যই আমরা এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে পারি না তবে এ নিয়ে আমাদের গবেষণা করতে হবে। তবে আমাদের সব থেকে বেশি যে বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে তা হলো মানসিক স্বাস্থ্য। স্কুল পর্যায় থেকে আমাদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।’

আর্ক ফাউন্ডেশনের সম্প্রতি এক অনলাইন গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিপর্যয়ের সময়ে অন্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৫ গুণ বেশি মানুষ বিষণ্ণতাজনিত রোগে এবং ১০ গুণ বেশি মানুষ উৎকণ্ঠাজনিত রোগে ভুগছেন। বিষণœতাজনিত সমস্যায় ভুগছেন ৩২ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ, যা গত বছর (২০১৯ সাল) জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত জরিপে ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ উৎকণ্ঠাজনিত রোগে ভুগছেন, যা আগে ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

গতকাল বিলস্ ও সাজিদা ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে এবং এসএনভি নেদারল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের সহযোগিতায় ‘কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য : বিনিয়োগ করুন’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবে।

প্রেস ক্লাবের এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাজিদা ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ম্যানেজার ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রুবিনা জাহান। বিলসের মহাসচিব ও নির্বাহী পরিচালক নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের দেশের শ্রম আইনে পেশাগত রোগ বিষয়টি উল্লেখ আছে, কাজ করতে গিয়ে শ্রমজীবীরা যেসব রোগে আক্রান্ত হন, তার তালিকায় অনেক রোগের উল্লেখ আছে। শ্রমিকরা যে পরিবেশে কাজ করেন এবং বাস করেন তাতে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়াটা অস্বাভাবিক নয়।

নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে মনের বন্ধু’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও  তৌহিদা শিপ্রা বলেন, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থের বিষয়টিতে মনোযোগী হওয়ার এখনই সময়। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, হতাশা এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইনোভেশন ফর ওয়েলবিইং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এবং মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি লিডার মনিরা রহমান প্রমুখ।