ইগাহ সুয়ানতেক : লাল দুর্গের নতুন রানী

ফ্রেঞ্চ ওপেন শুরুর আগে ইগাহ সুয়ানতেকের পক্ষে বাজি ধরার কেউ ছিল না। থাকার কথাও নয়। র‌্যাংকিংয়ের ৫৪তম খেলোয়াড়কে নিয়ে কে বাজি ধরতে চায়।

যে সুয়ানতেক কোনো ট্যুর শিরোপা জেতেননি। র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দশে থাকা কাউকে হারাতে পারেননি। কোনো গ্র্যান্ডস্ল্যামের কোয়ার্টার ফাইনালেও উঠতে পারেননি। শনিবার রাতে তিনিই হয়ে গেলেন লাল দুর্গের রানী। শুধু তাই নয় পোল্যান্ডের প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম জেতার নজির গড়লেন। টুর্নামেন্টে তিনি একটি সেটও হারাননি। চতুর্থ টিনএজার হিসেবে কোনো সেট না হেরে গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা জয়ের নজিরও গড়েছেন সুয়ানতেক। ১৯৯২ সালে মনিকা সেলেসের পর তিনিই কনিষ্ঠতম ফরাসি ওপেনজয়ী টেনিস তারকা। শিরোপা হাতে নিয়ে বলেছেন,‘আমি জানি না কী হচ্ছে। খুব..খুব আনন্দ হচ্ছে। পরিবারের সামনে এই জয় পাওয়াতে আমি বেশি আনন্দিত।’

সুয়ানতেকের বাবা রোয়ার। ১৯৮৮ সালের সিউল অলিম্পিকে খেলেছেন। চেয়েছিলেন ছোট মেয়েও বড় হয়ে অ্যাথলেট হোক। কিন্তু সুয়ানতেক হাতে তুলে নিলেন টেনিস র‌্যাকেট। প্রথমে অবশ্য বড় বোনের সঙ্গে সুইমিংপুলেও ঝাঁপিয়েছেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি। ভালোও লাগেনি। টেনিসই টানত তাকে। জুনিয়র পর্যায়ে সাফল্য সুয়ানতেককে র‌্যাকেট-বলের খেলার প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে। ২০১৫ সালে টানা চারটি জুনিয়র পর্যায়ের গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা জিতেছেন। যদিও ফ্রেঞ্চ ওপেনে সাফল্য পাওয়ার আগে সিনিয়রদের এককে কিছু করে উঠতে পারেননি।

সুয়ানতেক যে দেশ থেকে উঠে এসেছেন, সেই পোল্যান্ডের সমৃদ্ধ টেনিস ঐতিহ্য নেই। একমাত্র আগনিয়েস্কা রাদওয়ানেস্কাই কিছুটা নাম করেছিলেন। ২০১২ সালে উইম্বলডন ফাইনাল খেলেন তিনি। সেরা সাফল্য ওটুকুই। এখন হারিয়ে গেছেন। কাজেই সুয়ানতেকের সাফল্য তার দেশের জন্য আশ্চর্য ব্যতিক্রম। আর সেই ব্যতিক্রমী সাফল্যও এসেছে খুব বিরল ভাবে। ফাইনালে ৬-৪, ৬-১-এ তিনি হারিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সোফিয়া কেনিনকে।

আসলে ফ্রেঞ্চ ওপেনে টানা দুই সপ্তাহ একের পর এক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন সুয়ানতেক। প্রথম রাউন্ডে তিনি ৬-১, ৬-২ এ হারান গত বছরের রানার আপ মার্কেটা ভন্দোরাসোভাকে। যিনি ছিলেন এবারের টুর্নামেন্টের ১৫তম বাছাই। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে সু-উইকে ৬-১, ৬-৪ এ উড়িয়ে দেন। তৃতীয় রাউন্ডে নাম্বার ওয়ান সিমোনা হালেপকে বিদায় করেন ৬-৩, ৬-২ গেমে হারিয়ে। এরপর মার্তিনা ত্রেভিসান ও নাদিয়া পোদোরোস্কাকে হারিয়ে পা রাখেন ফাইনালে। শিরোপা লড়াইয়ে যাকে হারিয়েছেন সেই সোফিয়া কেনিন ছিলেন চতুর্থ বাছাই, অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের চ্যাম্পিয়ন।

২০০৭ সালে জাস্টিন হেনিন কোনো সেট না হেরে ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতেছিলেন। ১৩ বছর পর কোনো সেট না হেরে রোলাঁ গারোঁতে শিরোপা জিতলেন সুয়ানতেক। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ২৮টা গেম হেরেছেন। ১৯৭৯ সালে কিংবদন্তি ক্রিস এভার্টও মাত্র ২৮ গেম হেরে ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতেছিলেন। এ ক্ষেত্রে সুয়ানতেক-এভার্টের চেয়ে এগিয়ে আছেন কেবল স্টেফি গ্রাফ। ১৯৮৮ সালে তিনি মাত্র ২০ গেম হেরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালে র‌্যাঙ্কিং সিস্টেম চালু হওয়ার পর রোলাঁ গারোঁতে সুয়ানতেকের মতো এত পিছিয়ে থাকা কোনো খেলোয়াড় ফাইনাল খেলতে পারেননি। শনিবার প্রথম তিনটি গেম খুব সহজেই জিতে নেন সুয়ানতেক। এরপর কেনিন ঘুরে দাঁড়ান। প্রথম সেট ৩-৩ হওয়ার পরে আবার নিজের দক্ষতা মেলে ধরেন সুয়ানতেক। যার সামনে দাঁড়াতে পারেননি কেনিন। প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা জেতার পর সুয়ানতেক বলেছেন, ‘নিজেকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে। দুই সপ্তাহ দারুণ খেলেছি। আশা করিনি শিরোপা জিতব। আমার জন্য এটা বিস্ময়কর। বলতে পারেন জীবন বদলে দেওয়া অভিজ্ঞতা। মনে হচ্ছে ইতিহাস গড়েছি।’

এমন কৃতিত্বের পরেও কিন্তু পূর্বসূরি আগনিয়েস্কার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সুয়ানতেক, ‘আমার মনে হয় রাদওনেস্কার অর্জন অনেক বড়। শীর্ষে থেকে সে ডাব্লুটিএতে খেলেছে। অনেকেই তার সঙ্গে আমার তুলনা করে। কিন্তু পরিসংখ্যান আমার পক্ষে কথা বলে না। তবে সামনে সময় আছে। তার মতো হতে পারলে আমি খুশিই হব।’

সুয়ানতেকে আস্থা আছে খেলাধুলায় পোলান্ডকে বহির্বিশ্বে জনপ্রিয় করে তোলা ফুটবলার রবার্ট লেভানডোস্কির। শনিবার সুয়ানতেকের সাফল্য দেখে টুইটারে লিখেছেন, ‘কী দুরন্ত সাফল্য। বিখ্যাত একটা গল্পের মতো। দারুণ করেছ ইগাহ সুয়ানতেক।’