ডি সিলভা : লঙ্কান ক্রিকেট উৎকর্ষের রূপকার

এটা বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না যে, অরবিন্দ ডি সিলভার কারণেই ছিয়ানব্বই বিশ^কাপ জিতেছিল শ্রীলঙ্কা। সেমিফাইনালে ৬৬ রান করেছিলেন। ফাইনালে অপরাজিত ছিলেন ১০৭ রানে।

ভারতের বিপক্ষে ইডেন গার্ডেনসে ১ রানের মধ্যে আউট হয়েছিলেন সনাৎ জয়সুরিয়া ও রুমেশ কালুভিতারানা। ৩৫ রানে প্যাভিলিয়নে ফেরেন অশঙ্কা গুরুসিংহে। এরপর নিজের বাহুবলে ইডেন শাসন করেছিলেন ডি সিলভা। ছবির মতো ১৪টা বাউন্ডারি মেরেছিলেন। ইডেনের গ্যালারিকে স্তব্ধ করে দলকে পৌঁছে দিয়েছিলেন ২৫১ রানে।

ভারতের কী হাল হয়েছিল তার সাক্ষী ছিয়ানব্বইয়ের ১৩ মার্চের রাতের কলকাতা। ক্ষুব্ধ দর্শকরা স্টেডিয়ামের বাইরে ভাঙচুর করেছিল। ভেতরে বোতল ছুড়ে আগুন জে¦লে এমনই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে যে ম্যাচটাও শেষ  হয়নি। এমনকি শচিন টেন্ডুলকারের মিনতিও শোনেনি দর্শকরা। ৩৪.১ ওভারে ভারত ৮ উইকেটে ১২০ রানে থাকা অবস্থায় ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। শ্রীলঙ্কা জয়ী হলেও স্কোর বোর্ডে এখনো লেখা আছে, ‘ওন বাই ডিফল্ট’।

ইডেনে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন ডি সিলভা। এরপর গাদ্দাফিতে সেরা হয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফাইনালেও ব্যর্থ হয়েছিল লঙ্কার ভয়ংকর ওপেনিং জুটি। জয়সুরিয়া ৯ আর কালুভিতারানা ৬ রান করেছিলেন। এরপর গুরুসিংহকে নিয়ে ১২৫ রানের জুটি গড়েন ডি সিলভা। ম্যাচ থেকে অস্ট্রেলিয়া ওখানেই ছিটকে যায়। শেষ পর্যন্ত বৃষ্টিভেজা লাহোরে ১০৭ রানে অপরাজিত ছিলেন ডি সিলভা। বিশ্বকাপ উঠেছিল অর্জুনা রানাতুঙ্গার হাতে।

বিশ্বকাপের সেই দুটি ইনিংস নিয়ে রানাতুঙ্গা পরে বলেছিলেন, ‘আমার কাছে অন্যতম সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে সেমিফাইনালে ইডেনের সেই ইনিংস। তবে আরও স্মরণীয় অবশ্যই লাহোর ফাইনালের সেঞ্চুরি। কারণ ওটা আমাদের বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিল। ক্রিকেট জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে। বিশ্বকাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। বিশ্বসেরা। ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়।’

আক্ষরিক অর্থেই একটা এলেবেলে দলকে উৎকর্ষের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন ডি সিলভা। ১৯৮৪-তে যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু করেন তখন লঙ্কান ক্রিকেট প্রতিষ্ঠিতই হয়নি। উইন্ডিজে ওয়ানডে সিরিজ খেলে ফেরার পথে ইংল্যান্ডে তারা মাত্র একটা টেস্ট খেলার সুযোগ পেত। সে রকম এক টেস্টে ১৯৮৪ সালের ২৩ আগস্ট অভিষেক হয়েছিল ডি সিলভার। মাত্র ১৮ বছর বয়সে। লর্ডসের অভিষেক টেস্টে ৭ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ১৬ রান করেছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৩ রানে আউট হন। এর ছয় মাস আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মোরাতোয়ায় ওয়ানডে অভিষেকেও ব্যর্থ তিনি। মাত্র ৮ রানে আউট হয়েছিলেন।

ডি সিলভাকে ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ফয়সালাবাদ। ১৯৮৫ সালের পাকিস্তান সফরে শ্রীলঙ্কা প্রথম টেস্ট খেলেছিল ওখানেই। ইমরান-ওয়াসিম-আবদুল কাদিরের বিপক্ষে ১২২ রান করেছিলেন ডি সিলভা। ৫১০ মিনিট উইকেটে ছিলেন। ধৈর্য, দক্ষতা আর মনোনিবেশের এমন নজির গড়েছিলেন যেÑ অধিনায়ক দিলীপ মেন্ডিসের মতো বর্ষীয়ানও বলতে বাধ্য হন, ‘অরবিন্দ আমাদের অনুপ্রেরণা’।

ফয়সালাবাদে সেঞ্চুরির পর টেস্ট এবং ওয়ানডে নিয়মিত খেলেছেন ডি সিলভা। দল থেকে বাদ পড়ার প্রশ্ন ওঠেনি। তবে বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে স্বীকৃতি পেতে তার সময় লেগেছিল। মূলত ছিয়ানব্বইয়ের পরেই ডি সিলভা গ্রেট হয়ে ওঠার পথে চলেন।

অভিষেকের ৬ বছর পর প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছিলেন ডি সিলভা। ১৯৯০ সালের শেষে ভারতের বিপক্ষে নাগপুরের সেই সেঞ্চুরির পরেও প্রায় এক যুগ ওয়ানডে খেলেছেন তিনি। কিন্তু সেঞ্চুরি করেছেন ১১টি। সেই তুলনায় অনেক বেশি তার হাফসেঞ্চুরির সংখ্যা। ৩০৮ ওয়ানডেতে ৬৪টা হাফসেঞ্চুরি আছে ডি সিলভার। অথচ টেস্টে তিনি মাত্র ২২টা হাফসেঞ্চুরি করেছেন। আসল ব্যাপার হলো টেস্টে অর্ধশতককে শতকে (৯৩ টেস্টে ২০ সেঞ্চুরি) রূপান্তরিত করতে পারলেও  ডি সিলভা ওয়ানডেতে তা সেভাবে করতে সক্ষম হননি।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও সফল ছিলেন ডি সিলভা। মর্যাদার কাউন্টি খেলতে একটা মৌসুম কাটিয়েছিলেন কেন্টে। ৫৯.৩৬ গড়ে ১৭৮১ রান করেছিলেন। কেন্টে তখন তার সতীর্থ ছিলেন গ্রাহাম কাউড্রে। যিনি ডি সিলভা সম্পর্কে উইজডেন অ্যালমানাকে লিখেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না অন্য কোথাও অরবিন্দের চেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেটার আছে। আমার কাছে সে অনুপ্রেরণা। পুরো দলের কাছেও। ব্যাগ পত্তর গুছিয়ে সে যখন বিদায় নেওয়ার জন্য আমাদের জড়িয়ে ধরল তখন সবার চোখে জল।’     

ডি সিলভা শেষ টেস্ট খেলেছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে কলম্বোতে। করেছিলেন ২০৪ রান। এরপরই অবসর। আরও এক বছর ওয়ানডে খেললেও আগের জৌলুস ছিল না। তাই অবসর নিতে দেরি করেননি ৩৪.৯০ গড়ে ৯২৮৪ রান করা ডি সিলভা। টেস্টে যিনি ৪২.৯৭ গড়ে ৬৩৬১ রান করেছিলেন।

আজ কলম্বোতে ৫৫তম জন্মদিনের কেক কাটবেন লঙ্কান ক্রিকেট উৎকর্ষের রূপকার। যার প্রথম প্রেম ক্রিকেট হলেও কার আর কেকের প্রতিও এক সময় প্রবল আকর্ষণ ছিল।