কুমার সাঙ্গাকারা : অধ্যবসায়ী এক শিল্পীর গল্প

স্যার ডন ব্র্যাডম্যান তো ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যান। কিন্তু তার পরে সেরা কে? ব্র্যাডম্যান সেই ১৯৪৮ সালে অবসরে যাওয়ার পর থেকেই চলছে এই বিতর্ক। আজীবনের এই প্রশ্ন এখনো বিদ্যমান। স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস, শচিন টেন্ডুলকার, ব্যারি রিচার্ডস, গ্রাহাম গুচ, গ্রেগ চ্যাপেল, ব্রায়ান লারা ও রিকি পন্টিংদের নাম একের পর এক উঠে এসেছে সেরাদের তালিকায়। রান, ধারে, ভারে বা গুণে একেক ব্যাটসম্যান একেক ভাবে ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে তুলনীয়। পরিসংখ্যান হিসাবে এলে লঙ্কান গ্রেট কুমার সাঙ্গাকারাকেও যে রাখতে হবে এই বিতর্কে। ওয়ানডেতে দ্বিতীয় ও টেস্টে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক সাঙ্গাকারা এমনিতেই ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান।

ডন ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে সাঙ্গাকারার সবচেয়ে বেশি মিলটা কোথায় জানেন? ডাবল সেঞ্চুরিতে। টেস্টে সর্বোচ্চ ১২টি ডাবল সেঞ্চুরি আছে ডন ব্র্যাডম্যানের। সাঙ্গাকারা তার পেছনেই আছেন ১১টি দ্বিশতক নিয়ে। আর একটির জন্য ছুঁতে পারেননি ব্র্যাডম্যানকে। এ ছাড়া নয়টি ডাবল সেঞ্চুরি আছে ব্রায়ান লারার আর সাতটি করে ওয়ালি হ্যামন্ড ও বিরাট কোহলির। আরেকটি কারণে সাঙ্গাকারা সবার চেয়ে আলাদা। এক টেস্টের প্রথম ত্রিপল সেঞ্চুরি করে পরের ইনিংসেই সেঞ্চুরির কীর্তি গড়েছিলেন ইতিহাসের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে। ২০১৪ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে করেন ৩১৯ রান, যা তার ক্যারিয়ারসেরা। পরের ইনিংসেই ১০৫ করেন সাঙ্গাকারা। তিনি ছাড়া একমাত্র গ্রাহাম গুচের এই অসাধারণ সাফল্য আছে।

ব্যাটিং গড়ের হিসাবে নিজের সময়ের ব্যাটসম্যানদের চেয়ে এগিয়ে সাঙ্গাকারা। টেন্ডুলকার, দ্রাবিড়, পন্টিং, ক্যালিস, অ্যালিস্টার কুকরা রানের দিক থেকে তাকে পেছনে ফেলেছেন। কিন্তু ইনিংস-পিছু রান তোলায় কিন্তু সাঙ্গাকারা এগিয়ে। ১৩৪ টেস্টে তার গড় ৫৭.৪০। সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় সাঙ্গার ওপরে যে ছয়জন তাদের কারোরই ৫৬ গড় নেই। শুধু গড় আমলে নিলে ২৫ বা তার বেশি টেস্ট খেলা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সেরাদের তালিকায় অষ্টম সাঙ্গা। এর মধ্যে হালের একমাত্র স্টিভেন স্মিথ সাঙ্গাকে ছাড়িয়েছেন ৭৩ টেস্টে ৬২.৮৪ গড় নিয়ে। বাকি সাতজনের সবাই কমপক্ষে আশির দশকের আগের ক্রিকেটার। যথাক্রমে ব্র্যাডম্যান ৯৯.৯৪, হার্বার্ট সাটক্লিফ ৫৪ টেস্টে ৬০.৭৩, কেন ব্যারিংটন ৮২ টেস্টে ৫৮.৬৭, স্যার এভারটন উইকস ৪৮ টেস্টে ৫৮.৬১, ওয়ালি হ্যামন্ড ৮৫ টেস্টে ৫৮.৪৫ ও স্যার গ্যারি সোবার্স ৯৩ টেস্টে ৫৭.৭৮।

সাঙ্গাকারা যে শুধু একজন ব্যাটসম্যানই ছিলেন তা নয়, ক্যারিয়ারের অনেকটা সময় উইকেটের পেছনের দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে। কিপিং ছাড়ার পর থেকে সাবেক এই লঙ্কান অধিনায়কের ব্যাট আরো ক্ষুরধার হয়। সে সময়কার ব্যাটিং পারফরম্যান্স আরও বিস্ময়কর। ক্যারিয়ারে ১৩৪ টেস্টে কিপিং করা ৪৮টির পরিসংখ্যান বাদ দিলে তার নামের পাশে যা দাঁড়ায় সে রকম খেললে টেন্ডুলকারকেও হয়তো ছাড়িয়ে যেতেন সাঙ্গা। ২০১৪ সালের একটি পরিসংখ্যান বলছে, উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে ৪৮ টেস্টে ৪০.৪৮ গড়ে ৩১১৭ রান করেছেন। ৭ সেঞ্চুরির মধ্যে ২৩০ সর্বোচ্চ। কিন্তু শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে যে ৭৫ টেস্ট খেলেছেন তাতে ৮১৮১ রান করেছেন ৭০.৫২ গড়ে। এই সময়ে তার ২৯ সেঞ্চুরির মধ্যে ক্যারিয়ারসেরা ৩১৯ রানের ইনিংসও ছিল। ২০১৫ সালে অবসরের আগে আরও ১১টি টেস্ট খেলেছেন সাঙ্গা। এর মধ্যে করেছেন আরও দুটি ডাবল সেঞ্চুরি। ব্যাটসম্যান হিসেবে শুরু থেকেই খেললে কতদূর নিজেকে নিয়ে যেতেন কে জানে!

সাঙ্গাকারাকে নিয়ে বলতে হলে মাহেলা জয়াবর্ধনেকে নিয়েও বলতে হবে। দুই বন্ধু মিলে লঙ্কান ক্রিকেট শুধু নয়, বিশ্ব ক্রিকেটকেই দিয়েছেন অনেক। টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটিটি তাদের দুজনের নামে। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ২০০৬ সালে কলম্বো টেস্টে দুজনে ৬২৪ রান করেন। সাঙ্গাকারার অবদান ছিল ২৮৭ আর জয়াবর্ধনের ৩৭৪। জুটির গড়ে টেস্টে বেশি রানের তালিকায় তারা দুজন আছেন দুই নম্বরে। ২০০০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ৬৫৫৪ রান করেছেন তারা। এ তালিকার শীর্ষে রাহুল দ্রাবিড় ও শচিন টেন্ডুলকার জুটি ৬৯২০ রান নিয়ে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের পর ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কার একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের (২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ) কারিগরও সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে জুটি।

৪০৪ ওয়ানডে খেলে প্রায় ৪২ গড়ে ১৪,২৩৪ রান সংগ্রহ করেন কুমার সাঙ্গাকারা, সেঞ্চুরির সংখ্যা ২৫টি আর ফিফটি ৯৩টি। সঙ্গে গ্লাভস হাতে রয়েছে ৩৮৩টি ক্যাচ ও ৯৯টি স্টাম্পিং। টেস্ট ক্যারিয়ারটা আরও বেশি সমৃদ্ধ। ১৩৪ টেস্ট খেলে ৫৭.৪১ গড়ে তার সংগ্রহ ১২,৪০০ রান। টেস্টে সেঞ্চুরি ৩৮টি আর ফিফটি ৫২টি। দুই ফরম্যাটেই লঙ্কানদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক সাঙ্গাকারাই। আর ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় শচিনের পরেই তার অবস্থান। এখানে একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেখানে খেলোয়াড়দের খেলার ধার কমতে থাকে সেখানে সাঙ্গাকারার খেলার ধার বেড়েছে। এর পেছনে মূল রহস্য কী? মূল কারণ অধ্যবসায়। অনুশীলনে সাঙ্গাকারা ছিলেন ভীষণ মনোযোগী ছাত্র। কীভাবে নিজের খেলায় আরও উন্নতি করা যায় তা নিয়ে তিনি কোচদের সঙ্গে অনেক সময় ব্যয় করতেন। তার কাভার ড্রাইভকে বলা হয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম পারফেক্ট কাভার ড্রাইভ, তবে এটা কিন্তু মোটেও ঈশ্বরপ্রদত্ত কোনো প্রতিভার ফসল নয়! নেটে হাজার হাজার বার কাভার ড্রাইভের অনুশীলনের ফলেই এমনটা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানতেন, তার হাতে মাহেলার মতো অনেক বেশি শট নেই, কিংবা তিনি লারার মতো ন্যাচারাল স্ট্রোকমেকারও নন।

অবসরের পর ২০১৯ সালে মর্যাদাপূর্ণ এমসিসির প্রথম নন-ব্রিটিশ প্রেসিডেন্ট হন সাঙ্গাকারা। আজ ৪৩তম জন্মদিনে কুমার সাঙ্গাকারার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

ব্যাটসম্যান হিসেবে সাঙ্গাকারা যতটা সফল, অধিনায়ক হিসেবে ততটা নন। অন্তত বন্ধু মাহেলা জয়াবর্ধনের মতো সফল হতে পারেননি টেস্টে। ২০০৯ থেকে ২০১১, মাত্র দুই বছরে ১৫টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে জিতেছেন ৫টি টেস্ট, ড্র ৭টিতে আর হার ৩টিতে। যেখানে জয়াবর্ধনে ৩৮ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে জিতেছেন ১৮টিতে। ওয়ানডেতেও ওই দুই বছরই নেতৃত্বে ছিলেন সাঙ্গাকারা। ওয়ানডেতে অবশ্য তার রেকর্ড ভালো। এই সময়ে ৪৫ ম্যাচে জিতেছেন ২৭টিতে আর হার ১৪টি। ৪টি ম্যাচে কোনো ফলাফল হয়নি। তার অধীনে টি-টোয়েন্টিতে শ্রীলঙ্কা ২২ ম্যাচে ১৩টি জয় এবং ৯টিতে হেরেছে।