করোনায় কাঁকড়া শিল্পে ধস

করোনাভাইরাস সংক্রমণের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে দেশের কাঁকড়া চাষ শিল্পে। করোনা পরিস্থিতিতে বিদেশে কাঁকড়া রপ্তানি প্রায় বন্ধ। শুধু ব্যাংকক, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে সীমিত আকারে কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে, তবে দাম অনেক কম। যে কারণে ঢাকার রপ্তানিকারকরা এই মুহূর্তে কাঁকড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে খুলনা ও বাগেরহাটসহ উপকূলীয় এলাকার খামারে উৎপাদিত কাঁকড়া বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে। একই সঙ্গে কাঁকড়া চাষিদের পাওনা টাকাও দিতে চাইছেন না পাইকারি ক্রেতারা। এতে বিপাকে পড়েছেন এ অঞ্চলের হাজার হাজার কাঁকড়া চাষি। অল্প সময়ের মধ্যে এ অচলাবস্থা না কাটলে পুঁজি হারিয়ে পথে বসার শঙ্কা দেখা দিয়েছে শত শত ছোট-বড় খামারির।

খুলনার আড়তদাররা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৫ জানুয়ারি থেকে চীনে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আড়তগুলোতে ব্যবসায়ীরা এক প্রকার হাত গুটিয়ে বসে আছেন। অন্যদিকে উৎপাদিত কাঁকড়া বিক্রি করতে না পারায় কাঁকড়া খামারিরাও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। অচলাবস্থা না কাটলে এ অঞ্চলের প্রায় চার হাজার ছোট-বড় খামারিকে কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হবে।

কাঁকড়া চাষিরা জানান, চারটি গ্রেডে স্ত্রী কাঁকড়া এবং পাঁচটি গ্রেডে পুরুষ কাঁকড়া বিক্রি হয়ে থাকে। গ্রেড অনুযায়ী দামও কমবেশি হয়ে থাকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকাকালীন ২১০ গ্রামের ডবল এফ-১ স্ত্রী কাঁকড়ার কেজিপ্রতি মূল্য ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা। যা বর্তমানে নেমে এসেছে ৫০০ টাকায়। ৫০০ গ্রাম ওজনের ডবল এক্স এল পুরুষ কাঁকড়ার কেজিপ্রতি মূল্য ছিল ১১-১২০০ টাকা। যা বর্তমানে চলছে ৫০০ টাকা।

কয়রার ভাই ভাই কাঁকড়া ডিপোর বিদেশ মন্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে প্রতিদিন ১০০ কেজি কাঁকড়া কেনা হতো। যেখানে এখন পাঁচ কেজি কেনা হচ্ছে। তাও দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম।’

কয়রা উপজেলা কাঁকড়া ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপজেলা সদরসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কয়েক মাস আগেও এক হাজার হ্যাচারি ছিল। বর্তমানে তা কমে ৩০০টিতে দাঁড়িয়েছে। আর ডিপো ছিল তিন হাজারের বেশি, বর্তমানে হয়েছে ৫০০টি। করোনার কারণে চীনে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ ডিপো ও হ্যাচারি বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কর্মচারীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে।’

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পবিত্র কুমার দাস বলেন, ‘উপজেলায় ২০০ হেক্টর জমিতে প্রতি বছর চার হাজার মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়। এ বছর প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন কাঁকড়া নষ্ট হয়েছে। করোনার কারণে চাষিরা বেশ খারাপ অবস্থায় আছেন।’

কাঁকড়া উৎপাদনের অন্যতম জেলা বাগেরহাট। বাগেরহাটের সাত উপজেলায় ৭০৬ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৪১৬টি কাঁকড়ার খামার রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এখানে কাঁকড়া উৎপাদন হয় ২ হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন। আগামী অর্থবছরে কাঁকড়ার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু বিদেশের বাজারে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ থাকায় বাগেরহাটের চাষিরা চলতি মৌসুমে কাঁকড়া চাষে অনীহা দেখাচ্ছেন। গত অর্থবছরে কাঁকড়ার ভরা মৌসুমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিদেশের বাজারে হঠাৎ করে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দারুণভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন জেলার কয়েক হাজার চাষি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখনো না কমায় এ বছর চাষিরা কাঁকড়া চাষে নতুন করে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। গত কয়েক দিনে বাগেরহাটের কাঁকড়া চাষি, ডিপো মালিক ও মৎস্য বিভাগের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বাগেরহাট সদর উপজেলার বেমরতা ইউনিয়নের বেনেগাঁতি গ্রামের কাঁকড়া চাষি মোক্তার শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় হঠাৎ করে বিদেশে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। যার কারণে আমি ঘের থেকে সময়মতো কাঁকড়া না ধরায় তা সব মরে যায়। এ বছর প্রায় এক লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।’

আগামী মৌসুমের জন্য কাঁকড়ার চাষ করছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কবে কমবে তা কেউ বলতে পারছে না। বাজার কবে খুলবে তা অনিশ্চিত। তাই আমি আমার ঘেরে কোনো কাঁকড়া এখনো ছাড়িনি।’