৫৫ বছর পর চালু হচ্ছে ট্রেন

৫৫ বছর পর নীলফামারী চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন থেকে ভারতের হলদিবাড়ী বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি ইঞ্জিন পৌঁছেছে। এর মধ্য দিয়ে চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথে ট্রেন চলাচলের দ্বার খুলল। আগামী ডিসেম্বর মাস থেকে ট্রেন চলাচল করতে পারে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসক ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ অংশের সীমান্ত ছুঁয়ে চিলাহাটি-হলদিবাড়ী নবনির্মিত রেলপথে পরীক্ষামূলক চালানো হলো বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি ইঞ্জিন। একইভাবে গত ৮ অক্টোবর নীলফামারীর চিলাহাটি সীমান্ত ছুঁয়ে গেছে ভারতীয় রেলওয়ের একটি ইঞ্জিন। ওইদিন ভারতীয় একটি রেলইঞ্জিন দুই দেশের সীমান্ত পেরিয়ে শূন্য রেখায় ছুঁয়ে ফিরে যায়।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে চিলাহাটি রেলস্টেশন থেকে ভারতের হলদিবাড়ী রেলপথে ছেড়ে যায় একটি ইঞ্জিন। লোকোমাস্টার মনিরুল ইসলাম (৪০) বাংলাদেশ রেলওয়ের ৬৫০৯ বি-ই-ডি-৩০ ইঞ্জিনটি দুই দেশের সীমান্তের শূন্যরেখা ছুঁয়ে ফিরে আসে দুপুর ২টার দিকে। এর আগে ফিতা কেটে নবনির্মিত ওই পথে পরীক্ষামূলক রেল চলাচলের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী।

জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আশা করছি চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথে আগামী বিজয় দিবসে পণ্যবাহী ট্রেন আর স্বাধীনতা দিবসে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হবে। অথবা বিজয় দিবসেও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে। এ বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে চূড়ান্ত করে একটা ঘোষণা আসবে শিগগিরই।’

৫৫ বছর পর ওই সীমান্ত ছোঁয়া এলাকায় স্বপ্নের রেলইঞ্জিনের চলাচলে রেলপথের উভয় পাশে ভিড় জমে উৎসুক মানুষের। তারা দূর-দূরান্ত থেকে এসে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রেল চলাচল দেখেন। অনেকেই সীমান্তের অদূরে দাঁড়িয়ে উপভোগ করলেন রেলইঞ্জিনটির সীমান্ত ছোঁয়ার দৃশ্যটি।

ওই দৃশ্য উপভোগ করতে ৩৫ কিলোমিটার দূর থেকে সেখানে এসেছিলেন জেলার ডোমার উপজেলার হরিণচড়া ইউনিয়নের আশরাফ আলী (৫০)। তিনি বলেন, ‘বাবার কাছে শুনেছি আগে এ পথে ট্রেন চলেছিল। সে ট্রেনে আমার বাবা ভারতের কলকাতা পর্যন্ত ঘুরে এসেছিল। এরপর বন্ধ হলে ৫৫ বছর পর আমিও ট্রেনে এ পথে ভারতে চলাচলের স্বপ্ন দেখছি।’

ওই দৃশ্য উপভোগ করতে ৩ কিলোমিটার দূর থেকে সেখানে এসেছিলেন ভারতের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ীর সুদীপ্ত চক্রবর্তী (৪৫)। তিনি বলেন, ‘আগে এ পথে ট্রেন চলেছিল শুনেছি, কিন্তু আমরা দেখিনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশের রেল দেখতে পেলাম। ভাবতে ভালো লাগছে শিগগিরই আমরা এ পথে বাংলাদেশ যেতে পারব।’

পশ্চিমাঞ্চল রেলের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনন্দ মোহন চক্রবর্তী নবনির্মিত রেলপথে সীমান্তের শূন্যরেখা পর্যন্ত রেল চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ভারতের অংশে পরীক্ষামূলক রেল চালিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। আমাদের অংশে আজ সেটি সমাপ্ত হলো। এখন এ পথে রেল চলাচলে শুধু আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা।’

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রমতে, ১৯৬৫ সালের পর চিলাহাটি-হলদিবাড়ী পরিত্যক্ত রেলপথটি চালুর উদ্যোগ নেয় দুই দেশের সরকার। এ উদ্যোগে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি রেলস্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়েছে। এর আগে ভারতের হলদিবাড়ী রেলস্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণকাজ সমাপ্ত করে দুই দেশের সংযোগ স্থাপন করেছে। গত ৮ অক্টোবর ভারত তাদের অংশে শূন্যরেখা পর্যন্ত পরীক্ষামূলক রেল চালিয়েছে।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তান-ভারত বিভক্তের পরও এ পথে রেল চলাচল চালু ছিল। সে সময়ে এ পথে দুই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করত যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয় দুই দেশের মধ্যে রেল চলাচল। বন্ধ থাকা পথটি চালু করতে ৮০ কোটি ১৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বর্তমান সরকার। প্রকল্পটির মধ্যে রয়েছে চিলাহাটি রেলস্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ৬ দশমিক ৭২৪ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ ও ২ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার লুপলাইন নির্মাণসহ অন্যান্য অবকাঠামো।

গত বছর ২১ সেপ্টেম্বর চিলাহাটি রেলস্টেশন চত্বরে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। চলতি বছর ২৮ আগস্ট চিলাহাটির জিরো পয়েন্টে ভারত-বাংলাদশ সংযোগস্থলে রেলপথের নির্মাণকাজের পরিদর্শন করেন রেলপথমন্ত্রী।