যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের যৌন দাসত্বে বাধ্য করা কিথ রনিয়্যারি নামে এক সেক্স কাল্ট গুরুকে ১২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির আদালত। মঙ্গলবার ব্রুকলিনের আদালতে তাকে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ ডলার জরিমানাও করা হয়।
বিবিসি বাংলা জানায়, জালিয়াতি, যৌনকর্মের জন্য মানবপাচার, শিশু পর্নোগ্রাফিসহ অন্যান্য অপরাধে গত বছর অভিযুক্ত হন নেক্সিয়াম সেক্স কাল্টের এ প্রতিষ্ঠাতা।
নেতা হিসেবে তিনি নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং তাদের জোর করে বাধ্য করতেন তার যৌন সম্পর্ক করার জন্য।
কাল্টে থাকা ভুক্তভোগীদের ‘অপরিসীম ক্ষতি’ করার দায়ে ৬০ বছর বয়সী রনিয়্যারির বাকি জীবন কারাগারে থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন মামলার কৌঁসুলিরা।
গত বছর মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে রনিয়্যারি কোনো বক্তব্য দেননি। কাল্টের অন্যান্য নেতৃস্থানীয় সদস্যরা দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
রনিয়্যারির আইনজীবীরা প্রথম থেকেই তাকে নির্দোষ দাবি করে এসেছেন এবং তাকে অভিযুক্ত করার কারণ হিসেবে ‘মিথ্যা বক্তব্য দেয়ার জন্য অনুপ্রাণিত সাক্ষীদের ভিত্তিতে হওয়া মিডিয়া প্রচারণাকে’ দায়ী করেন।
২০১৭ সালে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ নেক্সিয়ামের বিপক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে।
১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া নিউইয়র্কের অ্যালবানি ভিত্তিক গ্রুপটি নিজেদের ‘মানুষের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে মানবিক মূলনীতির ভিত্তিতে তৈরি সম্প্রদায়’ হিসেবে পরিচয় দিত।
প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক মূলনীতি অনুযায়ী, তারা ‘উন্নত পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে।’ আলবেনি ভিত্তিক এই গ্রুপটি নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে লিখেছে, ‘মানবিক নীতিমালায় পরিচালিত একটি কমিউনিটি, যারা মানুষকে ক্ষমতাবান করতে চায়।’
তাদের দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ১৬ হাজারের বেশি মানুষের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু আসলে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নেতা রনিয়্যারি নারী কর্মীদের সঙ্গে দাস ও প্রভুর মতো সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। অনেক সময় গ্রুপের নারীদের তলপেটের একটি অংশ পুড়িয়ে রনিয়্যারির নামাঙ্কিত চিহ্ন বসিয়ে দেয়া হতো এবং সেগুলোর ভিডিও করা হতো।
এই গোষ্ঠীর সাবেক একজন সদস্য অভিযোগ করেছেন যে, তার ১৮ বছর বয়স হওয়ার পর্যন্ত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাকে নানাভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে যাতে রনিয়্যারি তার কুমারীত্ব নিতে পারে। ড্যানিয়েলা নামে পরিচয় করিয়ে দেয়া ওই নারী আদালতকে বলেছেন যে, তিনি ও তার অপ্রাপ্তবয়স্ক বোনকে রনিয়্যারি একাধিকবার যৌন মিলনে বাধ্য করে। এরপর তারা গর্ভবতী হলে তাদের গর্ভপাত করাতেও বাধ্য করা হয়।
হলিউডের অভিনেত্রী থেকে শুরু করে মেক্সিকোর সাবেক এক প্রেসিডেন্টের ছেলেও ওই কাল্টের সদস্য ছিলেন। তাদের অনেকে রনিয়্যারির বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্যও দিয়েছেন।
১৬ হাজারের বেশি ব্যক্তির সঙ্গে তারা কাজ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকায় তাদের কর্মকাণ্ড রয়েছে। ১৯৯৮ সালে নিউইয়র্কের আলব্যানিতে প্রথম গ্রুপটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যক্তিগত উন্নয়ন কোম্পানি হিসেবে এর যাত্রা শুরু। এই গ্রুপের সদস্য হিসেবে রয়েছেন সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অনেক নারী ও হলিউডের অভিনেত্রীও।
তবে তদন্তকারীরা বলছেন, মনিটরিং গ্রুপের আদলে প্রতিষ্ঠিত হলেও আসলে যৌন পাচারকারীদের একটি সংগঠন, যেখানে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন, পর্নোগ্রাফি আর সংঘবদ্ধ অপরাধ ঘটানো হতো।
ড্যানিয়েলা নামে এই গোষ্ঠীর সাবেক একজন সদস্য অভিযোগ করেছেন যে, তার ১৮ বছর বয়স হওয়ার পর্যন্ত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাকে নানাভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে যাতে, রনিয়্যারি তার কুমারীত্ব নিতে পারে।
১৮ বছর হওয়ার পরে রনিয়্যারি তাকে বলেন, ‘এখন সময় হয়েছে।’ যৌন মিলন করার জন্য রনিয়্যারি তাকে অফিসের একটি গুদাম ঘরে নিয়ে যান।
ড্যানিয়েলার আরেকজন বোনও এই গোষ্ঠীর নেতার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। তিনি অভিযোগ করেছেন, তাদের দুই বোনকেই কাল্ট নেতা রনিয়্যারি গ্রুপ যৌনকর্মে বাধ্য করতেন।
ড্যানিয়েলা বলেন, ‘আমরা পুরো সময়টা ধরে কাঁদতাম।’ একপর্যায়ে তারা দুই বোনই গর্ভবতী হয়ে পড়েন, তবে রনিয়্যারি তাদের গর্ভপাতে বাধ্য করেন।
নেক্সিয়ামের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন স্মলভিলের অভিনেত্রী অ্যালিসন ম্যাক
আদালতে উপস্থাপিত তথ্যে জানা যাচ্ছে, নেক্সিয়ামের ভেতর ‘ডস’ বা ‘ভোউ’ নামের আরেকটি গোপন চক্র ছিল। সেখানে অনেকটা পিরামিডের আদলে ‘দাসী’ আর ‘প্রভু’ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। এই চক্রের সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিলেন রনিয়্যারি, পুরো গ্রুপের একমাত্র পুরুষ সদস্য।
‘দাসীদের’ দায়িত্ব ছিল তাদের নিজেদের জন্য আরো ‘দাসীর’ নিয়োগ করা, যারা সবাই আসলে রনিয়্যারির সেবায় কাজ করতো।
এখানে যোগ দিতে হলে নারীদের এমন সব স্পর্শকাতর তথ্য দিতে হতো, যা তারা প্রকাশ করতে চান না। যার মধ্যে রয়েছে, নিজের বা পরিবারের সদস্যদের গোপন ছবি বা ভিডিও।
এই নারীদের নির্দিষ্ট ডায়েট মেনে চলতে হতো, যাতে তারা শুকনো থাকতে পারেন। তাদের বাড়ির কাজ থেকে রনিয়্যারির যৌন চাহিদা মেটাতে নারীদের প্রস্তুত করার মতো কাজ করতে হতো।
অনেক সময় গ্রুপের নারীদের তলপেটের একটি অংশ পুড়িয়ে রনিয়্যারির নামাঙ্কিত চিহ্ন বসিয়ে দেয়া হতো এবং সেগুলোর ভিডিও করা হতো। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুসারে, নেক্সিয়ামের সদস্যদের বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নগ্ন করে এভাবে ব্র্যান্ডিং করে দেয়া হতো।
আদালতে কয়েকজন সাক্ষ্য দিয়েছেন, ওই অনুষ্ঠানে চারটি অনুষঙ্গ থাকতো। বাতাস, মাটি আর পানি, পোড়ানোর কলমটি আগুন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে রনিয়্যারির আইনজীবী দাবি করেছেন, নারীরা স্বেচ্ছায় ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।