মহামারী করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমতে শুরু করলেও শীতকালে এটির দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে ভয়ে আছেন দেশের সাধারণ মানুষ। ভাইরাসটির কারণে প্রথমবারে অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লাখো খেটে খাওয়া মানুষ। অনেকের আবার চাকরি থাকলেও বকেয়া পড়ে আছে বেতন। কেউ পাচ্ছেন বেতনের অর্ধেক। তাছাড়া রয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সব মিলিয়ে দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে শ্রমজীবীদের মধ্যে শঙ্কা বিরাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সরকারকে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিন্তা করতে হবে।
রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেকেই চাকরি হারিয়ে কম ভাড়ায় নতুন বাসা খুঁজছেন। কেউ কেউ নতুন চাকরি খুঁজছেন। অনেকেই আবার চাকরির বদলে নতুন কিছু করার কথা ভাবছেন।
রাজধানীতে রাইড (পাঠাও) চালান এসএম মহাম্মদ জিসান। তিনি বলেন, ‘আমার মতো মধ্যবিত্ত যারা আছেন তাদের জন্যই সমস্যা। সরকারি চাকরিজীবীদের টাকার অভাব নেই, এসবে তাদের কোনো সমস্যাও না। যাত্রী কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ও কমে গেছে। যেটুকু হয় কোনো রকম চলছে। আগের বাসা ছেড়ে এখন মেসে থাকি। পরিবারকে অনেক আগেই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। শীতে করোনার প্রকোপ বাড়লে কোথায় যাবে?’
মো. রাজিব, রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমে যাওয়ায় লকডাউনে চাকরি চলে যায়। অনেক দিন বসে ছিলাম। এখন অটোরিকশা চালাই। করোনার প্রকোপ আবার বাড়লে আয় কমে যাবে। আবার যদি বসে থাকতে হয় তখন চলব কী করে চিন্তায় আছি।’
মতিঝিলে দৈনিক বাংলার মোড়ের শরবত বিক্রেতা নাজমুল বলেন, ‘দুই মাস হলো ফের ব্যবসা শুরু করলাম। তবে আগের মতো বেচাকেনা নেই। তারপর এখন জিনিসপত্রের যে দাম, সবজি খাওয়া তো ছেড়েই দিয়েছি। ছোট দুই মেয়েকে দুধ কিনে খাওয়াতে হয়। ওদের খাওয়াব, না নিজেরা খাব বুঝতে পারছি না।’
বেসরকারি সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে যে অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো সরকার হাতে নিয়েছে সেগুলো ঢেলে সাজানো এবং বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তাছাড়া করোনা প্রণোদনা প্যাকেজ যেটি রয়েছে তা আরও সম্প্রসারণ দরকার। ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ এখনো অনেক খাত সরাসরি হাতে পায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নও একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। করোনা সংক্রমণ যদি ফের বাড়ে তাহলে তা মোকাবিলায় প্রথমবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।’ করোনা ক্রাইসিস মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্যোগগুলোও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নইলে এ সংকটের সময় টিকে থাকা খুবই মুশকিল বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে সিপিডির পরিচালক (গবেষণা) ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘করোনার মধ্যে সরকার অর্থনৈতিক খাতগুলো খুলে দিয়েছে। এতে ঝুঁকি বেড়েছে। কিন্তু মৃত্যুহার কমের কারণে আমরা টিকে গিয়েছি। ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে সরকারের দেশ চালানো সম্ভব ছিল না। তাই সরকার ঝুঁকি নিয়েই এগুলো করেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসলে সরকারকে একই পন্থা অবলম্বন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে সরকারের দুই হাজার টাকা এককালীন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো দেওয়া শেষ হয়নি। এটা শেষ করা দরকার। তাছাড়া সরকারিভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, যেমন এবার বন্যায় গ্রামীণ অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে সেগুলো যদি ঠিক করা হয় এবং উন্নয়ন অবকাঠামো হাতে নেয় আগামী ছয় মাসকে সামনে রেখে। তাহলে এতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’এ প্রকল্পের অধীনে যদি গ্রামাঞ্চলে অথবা ছোট শহরে যে স্যুয়ারেজ সিস্টেম রয়েছে সেগুলো শহর অঞ্চলের মতো উন্নয়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলেও অনেক কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’