বাংলাদেশসহ ১৭ দেশের ২২ লাখ সদস্যের ২৬৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ

এস.পি.সি. ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস লিমিটেডে নামে একটি কোম্পানি ই-কমার্সের আড়ালে লাইসেন্স বিহীন পিরামিড আকৃতির অনলাইনভিত্তিক মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পরিচালনা করে প্রতারণার মাধ্যমে ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

ইন্টারনেট ভিত্তিক মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের ১৭টি দেশে এই এমএলএম ব্যবসা পরিচালিত হওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধ করা হতো বিকাশ, নগদ ও রকেট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে।

স্বল্প সময়ে অধিক কমিশনের লোভ দেখিয়ে গত ১০ মাসে ২২ লাখ সদস্য সংগ্রহ ও তাদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে এই টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও আলামিন প্রধান (৩২)।

জানা গেছে, আলামিন একসময় এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনিতে সক্রিয় ছিল। ডেসটিনি বন্ধ হয়ে গেলে সে ওই ব্যবসা পদ্ধতি অনুসরণ করে এই অনলাইনভিত্তিক প্রতারণা শুরু করে।

মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, গত ২৬ অক্টোবর থেকে সোমবার পর্যন্ত আলামিনসহ চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম) বিভাগের (ডিবি) অর্গানাইজড ক্রাইম প্রিভেনশন টিম। এ ঘটনায় রাজধানীর কলাবাগান থানায় মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইনে মামলা করেছে ডিবি।

তিনি জানান, গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর কলাবাগান থানাধীন এফ হক টাওয়ারে কোম্পানিটির অফিসে অভিযান চালিয়ে ম্যানেজার (হিসাব) মো. মানিক মিয়া (৩৪), ম্যানেজার (প্রোডাক্টস) মো. তানভীর আহম্মেদ (৩৫), সহকারী ম্যানেজার (প্রোডাক্টস) পাভেল সরকার (২৮) ও অফিস সহকারী নাদিম মো. ইয়াসির উল্লাহকে (২৮) গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সোমবার মোহাম্মদপুর এলাকা হতে মূল হোতা আলামিন প্রধান (৩২) ও মো. জসীমকে (৩২) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে, ১ টি হ্যারিয়ার গাড়ি, ২টি পিকআপ ভ্যান, সার্ভারে ব্যবহৃত ৬টি ল্যাপটপ, ২টি রাউটার, ২টি পাসপোর্ট ও বিভিন্ন কাগজপত্র জব্দ করা হয়।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আলামিন, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার ও বন্ধু জসীমের নামে এস.পি.সি. ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস লিমিটেডে নামে একটি ই-কমার্স কোম্পানির লাইসেন্স নেন। এর পর শুরু করেন অবৈধ এম এল এম ব্যবসা। ফেসবুক, ইউটিউবে চকটদার বিজ্ঞাপন দিত তারা। একসময় চরম আর্থিক সংকটে থাকলেও প্রতারণার মাধ্যমে তারা রাতারাতি কোটিপতি বনে যান। আলামিন এ কোম্পানিটির অনলাইন হোস্টিং এর জন্য শুধু আমাজনকেই প্রতি মাসে ৭০০০ ডলার পরিশোধ করত। অবৈধ ভাবে উপার্জিত টাকায় আলামিন সাভার ও নারায়ণগঞ্জে জমি কিনেছে, এ ছাড়া তার ৮টি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ১২ কোটি টাকা থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মো. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে জানান, চক্রের হোতা আলামিন অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির লোক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বেশির ভাগ সময় বন্ধ করে রাখত। চক্রটি অল্প দিনে প্রতারণার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে। বিদেশেও তাদের ৫ লাখ সদস্য রয়েছে। অন্তত ৭০টি দেশে তাদের কার্যক্রম চলমান ছিল বলে আলামিন স্বীকার করেছে। তবে আমরা এখন পর্যন্ত ১৭টি দেশের তথ্য পেয়েছি। তাদের অন্যান্য সহযোগীকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। এ ধরনের আরও কিছু কোম্পানির তথ্য রয়েছে আমাদের হাতে। তাদের বিরুদ্ধেও দ্রুত অভিযান চালানো হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছে, এমএলএম ব্যবসা আড়াল করার কৌশল হিসেবে কোম্পানিটি নামে মাত্র কয়েকটি পণ্য (অ্যালোভেরা শ্যাম্পু, ফেইসওয়াশ, চাল, ডাল, মরিচের গুঁড়া ইত্যাদি) শুধুমাত্র তাদের রেজিস্টার্ড মেম্বারদের কাছে বিক্রি করত। বিক্রীত লভ্যাংশ থেকে প্রতি আইডি হোল্ডারকে কোম্পানির বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখার বিনিময়ে ১০ টাকা করে প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হতো। তবে ৫০ দিন দেখার পর ৫০০ টাকা করে পেত তারা। গ্রেপ্তারকৃতরা ই-কমার্সের লাইসেন্স দেখিয়ে সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করায় যে তারা ই-কমার্স করছে ।  

ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, তারা মূলত কোম্পানির ওয়েব সাইট, ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউবে শত শত পোস্টের মাধ্যমে ই কমার্সের কথা বলে সাধারণ জনগণকে লোভনীয় কমিশনের লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতো। পরে আগ্রহীদের প্লে স্টোর বা এস.পি.সি. ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস লিমিটেডের ওয়েবসাইট থেকে একটি মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করে এর মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হতো। রেজিস্ট্রেশন করার সময় বাধ্যতামূলক পূর্ববর্তী রেজিস্ট্রিকৃত আপলিঙ্ক আইডির রেফারেন্সে কোম্পানির দেওয়া বিকাশ, নগদ, রকেট নম্বরে প্রতিটি আইডির জন্য ১২০০ টাকা পরিশোধ করতে বলা হতো। কোম্পানিটি বিভিন্ন ধরনের কমিশন যেমন (রেফার কমিশন, জেনারেশন কমিশন, রয়্যাল কমিশন) এর ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করত সদস্যদের সঙ্গে।

পিরামিড আকৃতির রেফার কমিশন সম্পর্কে সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মীর মোদাছ্ছের হোসেন বলেন, যে রেফার করবে সে তার নিচের ৩ টি আইডি থেকে ৪০০ টাকা করে কমিশন লাভ করবে। তারপর ওই ৩ আইডি থেকে যখন ৯টি আইডি হবে তখন আপলিংকের আইডি ২০% কমিশন পাবে। তারপর তার ডাউনলিংকে যত আইডি হবে আপার আইডি ১০% হারে কমিশন পাবে। যা মূলত পিরামিড আকৃতির হয়ে থাকে। এ ধরনের ব্যবসা বাংলাদেশের আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।