এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি ই-কমার্সের আড়ালে লাইসেন্সবিহীন পিরামিড আকৃতির অনলাইনভিত্তিক মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পরিচালনা করে ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ইন্টারনেটভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল এ ব্যবসা। রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধ করা হতো বিকাশ, নগদ ও রকেট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশে এ ব্যবসা পরিচালিত হওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। স্বল্প সময়ে অধিক কমিশনের লোভ দেখিয়ে গত ১০ মাসে ২২ লাখ সদস্য সংগ্রহ ও তাদের থেকে প্রতারণার মাধ্যমে এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও আলামিন প্রধান (৩২)।
জানা গেছে, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন আলামিন। গত ২৬ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত তিনিসহ চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম) বিভাগের (ডিবি) অর্গানাইজড ক্রাইম প্রিভেনশন টিম। এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩-তে একটি মামলা করেছে ডিবি। আইনটির তৃতীয় অধ্যায়ের ১৫ ধারায় বলা আছে, পিরামিডসদৃশ বিক্রয় কার্যক্রম ইত্যাদি নিষিদ্ধ। এ ধরনের আরও কিছু প্রতিষ্ঠান ডিবির নজরদারিতে রয়েছে।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্ত্রী শারমিন আক্তার, বন্ধু জসীম ও নিজের নামে এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস লিমিটেডে নামে একটি ই-কমার্স কোম্পানির লাইসেন্স নেন আলামিন। এরপর শুরু করেন লাইসেন্সবিহীন অবৈধ এমএলএম ব্যবসা। ফেইসবুক, ইউটিউবে চটকদার বিজ্ঞাপন দিতেন তারা। একসময় চরম আর্থিক সংকটে থাকলেও রাতারাতি কোটিপতি বনে যান তিনি। কোম্পানিটির অনলাইন হোস্টিংয়ের জন্য শুধু আমাজনকেই আলামিন প্রতি মাসে ৭ হাজার ডলার পরিশোধ করতেন। অবৈধভাবে উপার্জিত টাকায় তিনি সাভার ও নারায়ণগঞ্জে জমি কিনেছেন। এছাড়াও তার আটটি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ১২ কোটি টাকা থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মো. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চক্রের হোতা আলামিন অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বেশিরভাগ সময় বন্ধ করে রাখত। চক্রটি অল্প দিনে প্রতারণার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা কামিয়েছে। অন্তত ৭০টি দেশে তাদের কার্যক্রম চলমান ছিল বলে আলামিন স্বীকার করেছে। তবে আমরা এখন পর্যন্ত ১৭টি দেশের তথ্য পেয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘চক্রের হোতা আলামিনের সম্পদের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সাভার ও নারায়ণগঞ্জে তার নামে জমি রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। এছাড়া ইতিমধ্যে তার আটটি ব্যাংক হিসাবে ১২ কোটি টাকার তথ্য পাওয়া গেছে।’
২৬ অক্টোবর রাজধানীর কলাবাগান থানাধীন এফ হক টাওয়ারে কোম্পানিটির অফিসে অভিযান চালিয়ে ম্যানেজার (হিসাব) মো. মানিক মিয়া, ম্যানেজার (প্রোডাক্টস) মো. তানভীর আহম্মেদ, সহকারী ম্যানেজার (প্রোডাক্টস) পাভেল সরকার ও অফিস সহকারী নাদিম মো. ইয়াসির উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গত সোমবার মোহাম্মদপুর এলাকা হতে হোতা আলামিন প্রধান ও মো. জসীমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পিরামিড আকৃতির রেফার কমিশন সম্পর্কে সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মীর মোদাছ্ছের হোসেন বলেন, যে রেফার করবে সে তার নিচের তিনটি আইডি থেকে ৪০০ টাকা করে কমিশন লাভ করবে। তারপর ওই তিনটি আইডি থেকে যখন নয়টি আইডি হবে তখন অ্যাপলিঙ্কের আইডি ২০% কমিশন পাবে। তারপর তার ডাউনলিঙ্কে যত আইডি হবে আপার আইডি ১০% হারে কমিশন পাবে। যা মূলত পিরামিড
আকৃতির হয়ে থাকে। এ ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।