প্রথম মেয়াদে পৃথিবীকে যতভাবে পারা যায়, ততভাবে ‘জ্বালিয়েছেন’। কিছু অঞ্চলে যুদ্ধ থামিয়েছেন বটে, কিন্তু তার পেছনেও রয়েছে ‘ভিন্ন মতলব’। সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এবারের নির্বাচনেও ভোটের হিসাবে জো বাইডেনের খুব একটা পিছে পড়েননি।
ট্রাম্প কেন এত ভোট পান, তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণের অন্ত নেই। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সর্বোপরি বিশ্ব রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশ অনেকেই দেখিয়ে থাকেন। এসব এক পাশে সরিয়ে রেখে ড্যান পি. ম্যাকএডামস দ্য আটলান্টিকে লেখা কলামে কিছু কারণের কথা উল্লেখ করেছেন, যার সবটাই মনস্তাত্ত্বিক। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর এবং ডোনাল্ড জে ট্রাম্প. অ্যা সাইকোলজি রেকনিং বইয়ের এই লেখক বলেছেন, ‘ট্রাম্প মূলত বর্ণচোরা মানুষ। ভেতরে ভেতরে ভীষণ একা। স্বভাবে ব্যবসায়ী। তাকে আপনি কৌতুক অভিনেতা ভাবতে পারেন। ট্রাম্প নিজেও সেটা জানেন। আর এখানেই তার সার্থকতা।’
‘তার মারাত্মক সব ভুল কিংবা অপরাধকেও মানুষ কৌতুক মনে করে। গুরুত্ব দেয় না। তাতে সব ব্যর্থতা ঢাকা পড়ে যায়। জনপ্রিয়তা কমে না।’
‘ট্রাম্প যেসব কাজ করেন, যেভাবে কথা বলেন ওবামা কিংবা বাইডেন এর শতভাগের একভাগ করলে কী অবস্থা হবে একবার ভাবুন।’
ট্রাম্পের এত ভোট পাওয়ার রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশি প্রবাসী মনজুর চৌধুরী দারুণ কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন। টেক্সাসে বসবাসকারী মনজুর ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পকে আমরা যতই গালাগালি করি না কেন, নিজের লোকেদের কাছে তার যথেষ্ট চাহিদা আছে। লোকে ভাবে, তার মতো লোককে মানুষ কেন ভোট দেয়? বিশেষ করে শিক্ষিত শ্রেণির লোকেরা। আমাদের দেশেও এমন অনেকে আছেন, তারা নির্বাচিত হয়ে এমপি হন। এখানেও ঘটনা একই। যে যার স্বার্থ দেখে। ভোটের রাজনীতি সর্বক্ষেত্রে এই সমস্যায় জর্জরিত।’
‘থাকি টেক্সাসে, রেড স্টেট বলে খোদাই করা আছে এর নাম। এর মাঝে থাকি যে নেইবারহুডে, বেশিরভাগই শ্বেতাঙ্গ। ধরে নেয়া যেতে পারে বেশিরভাগই ট্রাম্প সাপোর্টার। বাস্তবেও অনেককেই দেখলাম প্রকাশ্যে ট্রাম্পের জন্য ভোট চেয়ে বাড়ির সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। আসলে ট্রাম্প সাপোর্টার না বলে বলা ভাল রিপাবলিকান। তাদের দল থেকে যদি একটা প্রাণীকেও দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়, তারা সেটাকেই ভোট দেবে। এর পেছনে কিছু কারণ আছে।’
১. যেকোনো জাতি নিজের স্বার্থ আগে দেখে। শ্বেতাঙ্গরাও তাই। তাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে অভিবাসীরা এসে তাদের চাকরি নিয়ে নিচ্ছে। আমেরিকানরা বেকার বসে থাকছে, আর বিদেশিরা এসে তাদেরই দেশে তাদেরই চাকরি খেয়ে ফেলছে। ঘটনার সত্যতা ব্যাপক।
যেমন, এক জেনারেশন আগেও আমেরিকায় হাইস্কুল সার্টিফিকেট কিংবা কলেজে অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি (দুই বছরে ষাট ক্রেডিট আওয়ার্স) নিয়েই লোকে ভাল ভাল চাকরিতে ঢুকে যেতে পারতো। তারপরে অফিসেই কাজ করতে করতে কাজ শিখতো, প্রমোশন পেয়ে পেয়ে সামনে এগোতো এবং ভাল একটা পদবিতে পৌঁছে রিটায়ার করতো। যাদের উচ্চশিক্ষার শখ ছিল, সেই কেবল সেদিকে পা বাড়াতো। বলে রাখি, এদেশে উচ্চশিক্ষা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সিটিজেনদেরই প্রতি সেমিস্টারে বারো ক্রেডিটের পেছনে পাঁচ থেকে দশ হাজার ডলার খরচ চলে যায়। বিদেশি ছাত্র/ছাত্রী হলে এর চারগুণ খরচ হয়। পুরো চার-পাঁচ বছরের পড়াশোনা শেষ করতে করতে তাই হাজার হাজার ডলার স্টুডেন্ট লোন দেনা জমে যায়। ভাল স্কলারশিপ না পেলে ওই পথে তাই অনেকেই যেতে চায় না।
মনজুর লিখেছেন, ‘আমার সাথে এক শ্বেতাঙ্গ মেয়ে পড়ত, সে বলতো তার মায়ের কোনো কলেজ ডিগ্রি নেই, তবু তিনি কাজ করেন এটিএন্ডটিতে (আমাদের দেশে গ্রামীণ ফোন বা বাংলালিংক ধরতে পারেন)। শুধু তাই না, তাকে অফিসেও যেতে হয় না, বাড়িতে বসেই কাজ করেন এবং বছরে নব্বই হাজার ডলার আয় করেন। টেক্সাসে প্রায় আট-নয় বছর আগে এক নারীর নব্বই হাজার ডলার বার্ষিক আয় বিশাল কিছু। এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি।
মনজুর যে অফিসে কাজ করেন, সেখানেও অন্য বিভাগে এমন অনেকেই আছেন। হাইস্কুল পাশ করে ছোটখাটো চাকরি করে শিখে-শিখে ম্যানেজার হয়ে বসে আছেন। কিন্তু গত কয়েক দশকে যা হয়েছে তা হচ্ছে বিদেশ থেকে (ভারত-চীন ও অন্যান্য) লোকজন মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন অথবা সেদেশে গিয়ে মাস্টার্স-পিএইচডি করছেন। পড়ালেখার পাশাপাশি কাজে প্রমাণ দিচ্ছেন তারা যোগ্য। ফলে উচ্চপদে তারা চাকরি নিয়ে নিচ্ছেন।
বেতনের ব্যাপারে শ্বেতাঙ্গদের (যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়ে) ডিমান্ড একটু বেশি থাকে। ভারত, বাংলাদেশ বা চীনাদের সেটাও নেই। সবাই যা পায়, তা পেলেই খুশি। ফলে আমেরিকানদের চাকরির সুযোগ কমছে। আগের মতো অনায়াসে কাজ তারা পাচ্ছেন না। টিকে থাকতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিতে হচ্ছে। পরিশ্রম করতে হচ্ছে। বেতনে এবং সুযোগ-সুবিধায় ছাড় দিতে হচ্ছে।
আমেরিকান মেডিকেল স্কুলে পড়তে হলে আগে আপনাকে চার বছরের ডিগ্রি নিতে হবে। সেখানে খুব ভাল রেজাল্ট থাকলে তাহলে এমক্যাট পরীক্ষা দিতে পারবেন। সেখানে ভাল স্কোর পেলে মেডিকেল স্কুলে সুযোগ পাবেন। তারপরে আরও কয়েক বছর হাড়ভাঙা পড়াশোনা। তারপরে ইন্টার্নশিপ/রেসিডেন্সি ইত্যাদি ইত্যাদি। কয়েক লাখ ডলার জমা হয় লোনের খাতায়। এদিকে দেখা যাচ্ছে ভারত/পাকিস্তান/বাংলাদেশ/চীন থেকে লোকজন মেডিকেলে পড়াশোনা করে একটি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে। কোনো লোন নেই। একজন আমেরিকান ডাক্তার যে বেতন চাইবে, তার তা না পেলেও চলবে। আবার তিনি যেটাতে রাজি হবেন, তাতে আমেরিকান ডাক্তারের পোষাবে না। সবক্ষেত্রেই এই ক্রাইসিস চলছে এখন। বিদেশি কর্মীদের ওপর বিরক্ত হয়েই তারা অনেকে রিপাবলিকান (ট্রাম্পের দল) সাপোর্ট করে।
২. অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সাদাদের একটি বড় অভিযোগ হচ্ছে অনেক দেশের অনেক দাগি অপরাধী দেশটিতে অনুপ্রবেশ করছে। তাদের মধ্যে সিরিয়াল কিলার, সিরিয়াল রেপিস্ট থেকে শুরু করে সাধারণ চোর পর্যন্ত সবই আছে। একশোর মধ্যে সংখ্যায় হয়তো এক হবে, কিন্তু ওই এককেই রিপাবলিকানরা এমনভাবে প্রোমোট করছে যে সাধারণ মানুষের কাছে মনে হচ্ছে ওই একই আসলে নিরানব্বই। এক শ্বেতাঙ্গ নারীকে তার ঘাস কাটার কর্মচারী ধর্ষণের পর খুন করেছিল। ব্যাকগ্রাউন্ড চেকে পাওয়া গেছে সে অবৈধ অভিবাসী এবং ম্যাক্সিকোতে অপরাধের রেকর্ড ছিল। মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই ঘটনাকে রিপাবলিকানরা হাজার বার প্রচার করেছে।
ম্যাক্সিকান গ্যাং, কিউবান গ্যাং, ইতালিয়ান গ্যাং ইত্যাদিতো আছেই। ড্রাগ ব্যবসা করছে, স্কুলের ছেলেমেয়েদের টার্গেট করছে, সবইতো সত্য। যৌন-ব্যবসায়ও এরা জড়িত। সাথে ইমিগ্রান্টদের ব্যাপারে যুক্ত করেছে প্রোপাগান্ডা, তারা নিজের দেশে খেতে পারে না, উদ্বাস্তু হয়ে থাকে। তাই সেদেশে গিয়ে অশান্তি সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কথা উল্লেখ করে মনজুর লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে অনেকেই এখন তাদের দেখতে পারে না, আমেরিকানদের দোষ দিবেন কেন? ঘটনাতো একই।’
৩. ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে কর্মীভিসার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। তার কথা হচ্ছে, আগে আমেরিকান হায়ার করা হবে, তারপরে যদি না পাওয়া যায়, তবেই বিদেশিদের ভিসা দিয়ে আনতে পারবে। সাধারণ মার্কিনিদের কাছে এই কাজটি কেন জনপ্রিয় হবে না সেটা কেউ ব্যাখ্যা করতে পারবেন? যেখানে চাকরির ক্ষেত্রে তারা দেখছে দলে দলে ‘বিদেশি’ এসে চাকরি নিয়ে যাচ্ছে।
৪. ট্রাম্প সরাসরি ইসলামিস্টদের বিরোধী। কিছু মানুষ বিতর্কিত কাজও করছেন। তাই রিপাবলিকানদের বিশ্বাস ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে, ভারতের বিরুদ্ধে, ল্যাটিনদের বিরুদ্ধে। কেবল তিনি আমেরিকানদের পক্ষে।
রেসিজম যেমন নিজের সঙ্গে না ঘটলে কেউ উপলব্ধি করে না। ঠিক তেমনি শ্বেতাঙ্গরা অনেকেই ট্রাম্পের বর্ণবাদ পাত্তা দেন না।
৫. ডেমোক্র্যাটরা সোশ্যাল সার্ভিস দিতে গিয়ে ট্যাক্স বাড়িয়ে দেয়, রিপাবলিকানরা কমায়। লোকজন এইটা দেখে না তার টাকায় গরিব মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে, তারা দেখে মাসিক পে-চেকে কত টাকা আসলো। একশো দুইশ ডলার বাড়তি আসা অনেকের জন্যই অনেক বিগডিল। যারা ব্যবসা করে, তাদের জন্য তো কথাই নেই।
৬. ডেমোক্র্যাটরা উদারনীতিতে বিশ্বাসী। রিপাবলিকানরা রক্ষণশীল। উদারনীতি অন্যদের জন্য ভাল। যেমন যে যার ধর্মচর্চা করবে, অথবা করবে না ইত্যাদি। গোল বাঁধে এখানেই যে ডেমোক্র্যাটরা গর্ভপাতের পক্ষে, যেখানে রিপাবলিকানরা সরাসরি ভ্রুণহত্যাকে শিশুহত্যা হিসেবে বিবেচনা করে। মায়ের প্রাণ বাঁচাতে গর্ভপাত এক ঘটনা, কিন্তু ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে, কিংবা আমি এখনও তৈরি না ইত্যাদি যুক্তিতে শিশুহত্যার সমর্থক তারা নয়। ডেমোক্র্যাটদের বিশ্বাস ‘আমার শরীর, তাই ভ্রূণ রাখা বা না রাখা আমার অধিকার।’ ব্যস, লেগে যায় কনফ্লিক্ট।
৭. সমকামীদের ব্যাপারেও ডেমোক্র্যাটরা উদার। দেশটিতে তাদের বিয়ের আইনও পাশ হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের কারণে। কনজারভেটিভ রিপাবলিকানদের মাঝে হোমোফোবিয়া তীব্রভাবে কাজ করে। তাদের বিশ্বাস, সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পেলে তাদের ছেলেমেয়েরাও সমকামিতার দিকে ঝুঁকবে। জেফরি ডামার নামের এক কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ছিলেন সেদেশে। তার বাবার কাছে ‘সন্তান সিরিয়াল কিলার’ এ পরিচয়ের চেয়েও লজ্জার বিষয় এই ছিল যে সে ছিল সমকামী! এতে বোঝা যায় একে কোন পর্যায়ের পাপ ও লজ্জার বিষয় হিসেবে তারা গণ্য করে।
৮. বন্দুক প্রেমও একটি নিয়ামক। সাধারণ টেক্সানদের বাড়িতে বাড়িতে বন্দুক থাকে। সাউথের প্রায় প্রতিটা রাজ্যেই এক অবস্থা। পাখি মারা বন্দুক না, মিলিটারি এসল্ট রাইফেল এগুলো। শিকারের কাজে ছাড়াও এমনিতেও রাখে তারা। গাড়িতে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে। বন্দুকের কারণে নিজের ছেলেমেয়ের সাথেও ঝগড়া করে কথাবার্তা বন্ধ করে দেয় লোকজন। এই অবস্থায় একটা গুজব চালু আছে যে ডেমোক্র্যাটরা অস্ত্র কেড়ে নিবে। যা আসলে ভিত্তিহীন। এনআরএ মোটা অঙ্কের টাকা এই দুই পক্ষকেই দেয়। তাদের কেউই ঘাঁটাবে না। সবই পলিটিকস। কিন্তু এই এই গুজবের কারণে অনেক ভোট ট্রাম্পের পক্ষে যায়।
মনজুর শেষে লিখেছেন, ‘একটি ব্যাপার মাথায় রাখবেন। পৃথিবীর বুকে আমেরিকাই একমাত্র দেশ যারা এর সিটিজেনদের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়দের (চেইন ইমিগ্রেশন) আনার সুযোগ দেয়। আশির দশকে আমার চাচা এসেছিলেন, তিনি সিটিজেন হয়ে তার ভাই-বোনদের জন্য এপ্লাই করেছিলেন বলেই আমরা এসেছি। আমার মা সিটিজেন হয়ে এখন মামা খালাদের জন্য এপ্লাই করেছেন, তাদের ডাক আসার অপেক্ষায় আছি। এই সুযোগ অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কেউই দেয় না।'
‘আমি আমার বোনকে এদেশে আনতে পারব, কিন্তু আমার বোন আমাকে অস্ট্রেলিয়ায় নিতে পারবে না। রিপাবলিকানরা বহু বছর ধরেই এই আইন বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। কোনোদিন বন্ধ করে দেবে কেউ জানে না। ডিভি ভিসা বাংলাদেশের কোটা বহু বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই কোনো ইমিগ্রান্ট ভোটারের কেবল এই একটি বিষয় হলেও বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।’