আনা ইভানোভিচের মেয়েবেলার সঙ্গে যুদ্ধ জড়িয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে এখনো হয়তো বোমারু বিমানের শব্দ শুনতে পান।
১৯৮৭ সালের ৫ নভেম্বর যুগোস্ল্াভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে জন্ম হয়েছিল আনার। পরে যুগোস্ল্াভিয়া ভেঙে সার্বিয়ার জন্ম হয়। কট্টর নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের শাসনামলে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত হয় দেশটি। এরপর ন্যাটোর হস্তক্ষেপ। ১৯৯৯ সালে মিলোসেভিচকে হটাতে ন্যাটো যখন বেলগ্রেডে বিমান হামলা করছে তখন আনা ইভানোভিচের বয়স ১২। এখনো ভয়ংকর সেইসব দিনের স্মৃতি মনে করতে পারেন, ‘টানা ৭৮ দিন বোমা পড়ার মধ্যেই বন্ধুদের সঙ্গে শুকিয়ে যাওয়া সুইমিং পুলে টেনিস খেলতাম। পুলটা খুব পুরনো ছিল। পানি ধরে রাখা যাচ্ছিল না। তাই ওটা খালি করে ভেতরে কার্পেট পেতে দুটি টেনিস কোর্ট করা হয়েছিল। কিন্তু ক্রস কোর্ট শট মারা যাচ্ছিল না। শুধু খেলতাম ডাউন দ্য লাইন শট। মনে আছে তখন দেশের বাইরে কোনো টুর্নামেন্টে হলে খেলতে যেতাম ট্রেনে অথবা সড়কপথে। ন্যাটোর হামলায় বেলগ্রেডের সমস্ত বিমান বাতিল করা হয়েছিল। একবার তো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে বাবা-মার সঙ্গে ৭ ঘণ্টা গাড়িতে চেপে হাঙ্গেরি যেতে হয়েছিল। সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা যেন আর কারও না হয়।’
সম্ভবত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠার কারণে দ্রুত শিখে নিয়েছিলেন কোর্টের লড়াই। পরে এক সাক্ষাৎকারে আনা বলেছিলেন, ‘সেই বিমান হামলা আমাদের আরও শক্তপোক্ত করে তুলেছিল। ওই আড়াই মাসকে আমরা ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতে শিখে গিয়েছিলাম। তখনো আমরা ছোট। ভেবেছিলাম যাক এখন আর স্কুলে যেতে হবে না। আরও বেশি করে টেনিস খেলতে পারব। ঠিক আমাদের মাথার ওপর থেকে বিমান উড়ে যাওয়ার মধ্যেই টানা দু’মাস দিনের বেলাগুলো কাটিয়েছিলাম টেনিস কোর্টে। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক পরই প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়েছিল।’
পালিয়ে মা-বাবার সঙ্গে ট্রেনে করে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে গিয়ে ওঠেন টেনিস কোচ ড্যান হজম্যানের বাড়িতে। সেখানে উন্নত সুবিধা আর ট্রেনিং আনা ইভানোভিচকে তৈরি করেছিল। কৃতিত্ব দিতে হবে হজম্যানকে। অবশ্য টেনিস শেখা ছাড়া ১৩ বছরের কিশোরীর সামনে আর কোনো পথও খোলা ছিল না। হজম্যানও আন্তরিকতার সঙ্গেই শিখিয়েছিলেন। ১৫ বছর বয়সে একটা ম্যাচ হেরে লকার রুমে চার ঘণ্টা দরজা বন্ধ করে কেঁদেছিলেন আনা। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন ম্যাচ হারার অপরাধে হজম্যান তাকে তাড়িয়ে দেবেন। বাস্তবে তা ঘটেনি। সস্নেহে হারের কারণ বুঝিয়েছিলেন। তারকা হওয়ার পরেও হজম্যানের শিক্ষার কথা ভোলেননি আনা। মারিয়া শারাপোভার কাছে ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনাল হারার পর আরেক রুশ দিনারা সাফিনাকে হারিয়ে ফরাসি ওপেন চ্যাম্পিয়ন হন। এ সূত্রে নাম্বার ওয়ান হয়েছিলেন। এ সবই ড্যান হজম্যানের কারণে। ‘হজম্যান ছিলেন বলেই এখানে আসতে পেরেছি’ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন ইভানোভিচ।
আনার মা ড্রাংগানা ছিলেন আইনজীবী। বাবা মিরোস্লাভের নিজস্ব ব্যবসা ছিল বেলগ্রেডে। যুদ্ধের আগে অভিজাত পরিবেশে বড় হয়েছিলেন আনা। টেলিভিশনে মনিকা সেলেসের খেলা দেখে ৫ বছর বয়সে টেনিস র্যাকেট হাতে তুলে নেন। তারপর নিজেই হয়ে উঠেছিলেন সার্বিয়ান টেনিসের উজ্জ্বলতম তারকা। একসময় মনে করা হতো যুদ্ধবিধ্বস্ত সার্বিয়া থেকে উঠে এসে নোভাক জকোভিচ, ইয়েলেন ইয়াঙ্কোভিচ আর আনা ইভানোভিচ মিলে টেনিস দুনিয়া শাসন করবেন। জকোভিচ এখনো শাসন করছেন। কিন্তু আনা ইভানোভিচরা হারিয়ে গেছেন।
ক্যারিয়ারে মাত্র একটা গ্র্যান্ডস্ল্যাম জিতেছেন আনা। সব মিলিয়ে শিরোপা ১৫টি। অথচ নাম্বার ওয়ান হওয়ার পর বরিস বেকার পর্যন্ত তাকে নারী টেনিসের প্রবল সম্ভাবনা বলেছিলেন। আনা নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। মাত্র ২৯ বছরেই কোর্ট থেকে হারিয়ে গেছেন। ২০১৬ সালে সার্ব সুন্দরী বিয়ে করেছেন জার্মান ফুটবল তারকা বাস্টিয়ান শোয়েইনস্টাইগারকে। ভেনিসে বিয়ের পর নৌবিহার করেছিলেন। এরপর সুখী-গৃহকোণ ছাড়া কিছু ভাবেননি। এখন আনা ইভানোভিচ হয়ে গেছেন আনা শোয়েইনস্টাইগার।