আনটোল্ড স্টোরি অব আ শেফ

বাদলা দিনের দুপুর বেলায় বা শীতের রাতে খুব বেশি খেতে ইচ্ছে করে ভুনা খিচুড়ি। সাথে যদি থাকে কালোভুনা, ইলিশ আর বেগুন ভাজি। কেউ যদি টেবিলে আপনার জন্য সাজিয়ে রাখে, একবার ভাবুন আপনার কেমন লাগবে!

কখনো কি ভেবেছেন এই ফুডের পিছনের সেই শিল্পীদের কথা? আজ আমি আপনাদের এই রন্ধন এর গল্প বলবো ।

আমি জেভিয়ার (Chef Xavier) এদের একজন। পড়ালেখা করেছি কালিনারি নিয়ে, ব্যাচেলার করেছি ফুড এন্ড প্রফেশলাল কুকারী নিয়ে (UNIVERSITY OF WEST LONDON) থেকে, গ্রেজুয়েট (UNIVERSITY COLLEGE BURMINGHAM) থেকে আর মাস্টার্স করেছি কালিনারি আর্টস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে (UNIVERSITY OF BIRMINGHAM)।

সেই সুবাদে সৌভাগ্য হয়েছিল যুক্তরাজ্যের নামকরা কিছু জায়গায় কাজ করার। তার মধ্যে অন্যতম হল (MICHELIN STAR), (LONDON MARRIOTT HOTEL COUNTY HAL),  (SHANGRI_LA. THE SHARD), হেড শেফ ছিলাম (KOBE STEAK HOUSE), হেড শেফ লেকচারার হিসেবে দেশের ব্রিটিশ কালিনারি ইউনিস্টিটিউড Welcome Skills এ। আর কন্টিনেটাল রেস্টুরেন্ট (SAVVA), তে হেড শেফ ।

যদিও একসময় কুকিং নিয়ে পড়ালেখা বা কিচেনে কাজ করা ভালো চোখে দেখা হতো না। কিন্তু ধীরে ধীরে বাংলাদেশ উন্নতি করছে, সাথে পরিবর্তন হয়েছে আমাদের চিন্তা ভাবনার। এখন অনেকে এটা নিয়ে ক্যারিয়ার তৈরি করতে চায়, তাদের জন্য এই লেখা, ফুডকে ভালোবেসে, আপনি যদি সঠিক ভাবে আগাতে পারেন খুব অল্প দিনে আপনি প্রতিষ্ঠিত হবেন। 

যদি রান্না আপনার ভালোবাসা হয়, আপনি যদি রান্না পছন্দ করেন এবং শেফ হওয়ার জন্য আগ্রহী হন!! আমি আবার বলছি আর একবার ভাবুন, আপনার মন যদি বলে আমি সত্যিকারের শেফ হতে চাই, তাহলে নেমে আসুন রান্নার মহা সাগরে।

আপনারাতো জানেন ভালোবাসার উপর আর কিছু নাই। এই পেশাকে ভালোবেসে,  আপনি অনেক দূর যেতে পারবেন।

শেফ পেশা : প্রথমে বলে রাখি এই ক্যারিয়ারের সুযোগ হচ্ছে সীমাহীন। রন্ধন শিল্পে ক্যারিয়ারের জন্য আপনি নিজেকে উৎসর্গ করে দিতে হবে সাথে দুর্দান্ত সাংগঠনিক, পরিচালনার দক্ষতা এবং সর্বোপরি, খাদ্যের প্রতি আকাশের মতো বিশাল ভালোবাসা দরকার, একজন শেফের অনেক কাজ । মেনু থেকে শুরু করে প্রেজেন্টেশন করা, বিজনেস কে ডেভেলপ বা নতুন কিছু ইমপ্লিমেন্ট করা, নিউট্রিশন চোখ রাখা বা স্পেসালাইজেড পেশেন্ট এর জন্য মিল প্লেন করা,অবশ্যই ফুড সেফটির দিকে খেয়াল রাখা।

এছাড়া আপনি বিভিন্ন দেশের কুজিন নিয়ে যেমন থাই-ইন্ডিয়ান-কন্টিন্যান্টাল -মেক্সিকান ফুড নিয়ে কাজ করে ওই দেশের পিপল বা তাদের কালচার মোট কথা হলো (FOOD GASTRONOMY) আপনি অনেক কিছু  জানতে পারবেন।

খাদ্য এবং রান্নার জন্য আবেগ ভালোবাসা: এটা এমন এক জিনিস যার আছে সে বুঝবে এর প্রয়োজন কতটুকু। আপনার যদি তা থাকে তবে আপনি অর্ধেক যুদ্ধ জিতেগেছেন, এইটার জন্য কিচেনের লম্বা ঘন্টাগুলো ও আপনার কাছে শুধু একটা সংখ্যা হবে, এই আবেগ নামক জ্বালানি আপনাকে নিয়ে যাবে আপনার গন্তব্য।

ডেডিকেশন: আমি সবসময় বিশ্বাস করি রান্না নিয়ে পড়ার কোন বিকল্প নাই। অনেকে হয়তো আমার সাথে দ্বিমত হতে পারেন তবুও আমি মন থেকে এইটা বিশ্বাস করি। আপনার যদি জানার আগ্রহ থাকে  আপনাকে বিদ্যা অর্জন করতে হবে। এই বিদ্যা আহরণ অবিরাম চলতে থাকবে রান্নার পড়ালেখা শুধু কাটিং আর কুকিং না, ফুড সাইন্স থেকে কেমেস্ট্রি, নিউট্রেশন থেকে ফুড মাইক্রোবাইলজি, শেফ হওয়ার অর্থ একটি 360-ডিগ্রি শিক্ষা যার মধ্যে রান্নাঘর, ব্যবসা এবং তালিকা পরিচালনার পুরোপুরি জ্ঞান থাকার পাশাপাশি রেসিপি বিকাশ, মেনু তৈরি এবং মূল্য অন্তর্ভুক্ত।

ভবিষ্যতে আপনি যে কোনও পথে চলার জন্য বেছে নিন, একজন সফল শেফ হওয়ার জন্য আপনাকেও সৃজনশীল হতে হবে। আপনাকে নতুন রেসিপিগুলি তৈরি করার বিষয়ে অনুরাগী ও হতে হবে, আপনার আবেগ এমন হতে হবে যা আপনাকে প্রেরণা দেয় এবং বিভিন্ন উপাদান এবং স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা করতে ভয় পাবেন না।

মেন্টর: আমার কাছে এই মেন্টরশীপটা  খুব ইম্পর্টেন্ট মনে হয়। তার কারণও আছে। একজন পরামর্শদাতা হলেন একজন ব্যক্তি, যিনি আপনাকে গাইড করতে, আপনাকে সহায়তা করতে পারবে আপনাকে সব সময় মোটিভেট রাখতে পারবে। কারণ সফলতা একদিনে আসে না একটা লম্বা সঠিক পথের পর সফলতা ধরা দেই। তখন তার সফল হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেই জন্য প্রয়োজন একজন দক্ষ অভিভাবক।

ধৈর্য: এটি সত্য যে কঠোর পরিশ্রম না করে কেউ শেফ হতে পারে না। রান্নার সমস্ত কৌশলকে জানতে  এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত জ্ঞান অর্জন করতে অনেক সময় লাগে, তাই ধৈর্য হলো এই ইন্ডাস্ট্রির জন্যে অতীব প্রয়োজনীয় একটা গুন্। আপনি শিখতে গেলে অনেক ভুল করবেন, আপনার হাত কেঁটে যাবে, আপনি মাঝে মাঝে হতাশায় ভুগবেন । আপনি সফল হবেন তখন যখন আপনার ধৈর্য থাকবে, রাতারাতি কেও সব শিখতে পারে না বা শেফ হতেও পারে না। আর সব কিছুর জন্যে ধৈর্য থাকতে হবে। আমি আপনাকে অনুরোধ করবো পৃথিবীর বড় শেফদের জীবনী উইকিতে একটু দেখতে, কীভাবে তারা আজ একজন ষ্টার শেফ বা এত এত রেস্টুরেন্ট এর মালিক- এক সময়ের ধৈর্য আজকে তাদের নিয়ে গেছে সফলতার বন্দরে।

শেফ ট্রেনিং: অনেকে বলে শেফ হতে পড়ালেখা করতে হয় না। আমি এইটার সাথে একমত না। শেফ হওয়ার জন্য আপনার ভালো সলিড ভিত্তি প্রয়োজন, যাতে আপনি মৌলিক কৌশল অর্জন করতে পারেন এবং বিভিন্ন কার্যকরী পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হন। আপনি যখন কোনও রেস্তোঁরায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন তখন আপনার দক্ষতা এবং কৌশলগুলি আপনাকে যে শেফ শিখিয়েছিল তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই নিজেকে ঘর থেকে বের করে আনুন, আপনার স্কুল থেকে শিখুন যেখান থেকে শিখুন সব সময় সেরাটা শিখবেন, দরকার হলে লাখ থাকা খরচ করে বাইরের কোনো ফাইন শেফের কাছে চলে যান শেখার জন্য।  

তাইতো প্রথমে মহাসাগর বলছি, তাই লং টাইম সাঁতার কাটতে হলে পড়ালেখা আর ভালো কোনো কুকিং স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ এর বিকল্প নাই। শেফ এবং যারা খাবার পছন্দ করেন তাদের কাছে এটি শৈল্পিক প্রকাশের একধরণের রূপ। তার এক্সপেরিয়েন্স গুলো কোয়ালিটিপুল না হলে বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে তার সেই এক্সপেরিনসের কোনো মূল্য নাই। ভুল রাস্তায় একবার গেলে, অনেকগুলো ভুল আপনার সাথে হবে। 

নেতৃত্বের গুণাবলী: কুক আর শেফের এর মধ্যে একটা সীমারেখা আছে, তাই শেফ হওয়া মানে শুধু রান্না করা নয়, সিনিয়র রোলে আপনাকে পুরো বিষয়টা পরিচালনা করতে হবে, আপনাকে একজন সত্যিকারে লিডার হতে হবে এবং সঠিক ভাবে আপনার দলকে পরিচালনা করতে হবে। আমি এমনও হেড শেফ দেখছি, যারা নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে এবং খারাপ ভাষা ব্যবহার করেন, যদিও আধুনিক সময়ে এইটা এখন গ্রহণযোগ্য না, তো লিডারকে হতে হবে দলের প্রাণ ভোমরা। তাকে কর্মীদের পরিচালনা এবং তাদের অনুপ্রাণিত করার দক্ষতা থাকতে হবে যাতে তারা একসাথে সর্বোচ্চ মানের খাবার ক্রমাগত উৎপাদন করতে পারে।

সিদ্বান্ত গ্রহণের গুন: শেফের একটা গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হ'ল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সিদ্ধান্তগুলি সঠিক হতে হবে; কারণ আপনার ভুল সিদ্বান্ত অনেক প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে, সুতরাং চিন্তাভাবনা এবং বিচারের স্পষ্টতা একটি শেফের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

কুকিং বুক : আমার পার্সোনাল কুকিং, মাইক্রোবায়োলজি , ফুড সায়েন্স, নিউট্রিশন বুক আছে ১২৫ টার উপর, আর ইবুক আর কালিনারি রিসোর্স অসংখ্য। পড়ার কোনো বিকল্প নাই। নতুন নতুন আর্টিকেল, মডার্ন কুকিং এর বই আর সাথে বড় বড় শেফদের জীবিনী আপনাকে পড়ার মধ্যে থাকতে হবে। 

আমি যখন এক শহর থেকে আর এক শহরের ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসে যেতাম বা সেইম শহরের ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসে যেতাম আমার কাঁদের ব্যাগে সব সময় কুকিং বুক থাকতো, এমনকি উইনিভার্সিটির ১৫/২০ টা বই আমার বাসায় সব সময় এনে রেখে দিতাম,যদি শুধু ফাইন দিতে হতো অন টাইমে ফেরত দিতে পারতাম না বলে। আপনার সময় নাই পড়ার, যদি শুধু বইগুলো নড়েচেড়ে দেখেন তাতে আপনি অনেক কিছু জানবেন । এই সমুদ্রে জানার কোনো শেষ নাই আপনার আগ্রহ আর জ্ঞান বাড়তে থাকবে, তাতে আপনার কনফিডেন্ট লেভেল এর পারদ ও উপরে উঠবে ।

নিজের ল্যাবরেটরি: পৃথিবীর ষ্টার শেফদের ফুড আপনাকে বিমোহিত করবে, তাদের প্লেটের প্রতিটি ইনগ্রিডেন্টস যেন গিটারের তারে বাধা, প্রতিটি ইনগ্রিডেন্টস রিলেটেড একটার সাথে আর একটা। তাদের প্রতিটি ফুড সার্ভিস কিচেনে থেকে গেস্টদের কাছে আসার আগে তাদের টেস্ট কিচেন বা ডেভেলাফ কিচেনে এইগুলো নিয়ে অনেক গবেষণা আর টেস্ট এর ব্যালেন্স আর পারফেক্ট পেজেন্টেশন করার পর টেস্টিং মেনু হিসেবে গেস্টদের কে সার্ভ করার পর তাদের ফিডব্যাক নিয়ে এইগুলো সার্ভিস কিচেনের মেনুতে এড হয়। নিজের গবেষণার জন্য সময় রাখুন,ফুডকে ইমাজিন করুন, পেয়ার করুন, ওয়ে অফ কুকিং বা প্রেসেন্টেশন সব কিছু নিয়ে আপনার স্টেডিয়ামে আপনি সময় ব্যয় করুন। বড় কিছু হতে হলে বড় কিছু নিয়ে চিন্তা করুন।

আমার ভাবনা: আমি সব সময় বলি আমার স্টুডেন্টদেরকে কে দুইটা বছর নিজের মন, শরীর সব সমপন করো, ভালো জায়গা বা শেফ থেকে শিখো, নেবার স্টপ লার্নিং এন্ড নেভার স্টপ এক্সপ্লোরিং টেস্ট (Never stop learning and never stop exploring taste)। প্রথমে তোমাকে ইনভেস্ট করতে হবে, টাকা দিয়ে হলেও ভালো শেফের সাথে কাজ করতে হবে ইভেন বাইরে ষ্টার শেফের আন্ডারে ট্রেনিং নিতে হবে।

প্রথম স্টেপগুলো যদি রাইট জায়গায় হয়, পরের গুলো অটো রাইট হয়ে যাবে। 

শেষ কথা: আপনাকে মইয়ের নিচে থেকে শুরু করে, আপনাকে আপনার সফলতার জন্য সিঁড়িগুলো অতিক্রম করতে হবে, আবারও বলছি কোনও শর্ট কাট নেই । তাই ক্যারিয়ার হিসাবে এটি বেছে নেবেন না যদি ধৈর্য না থাকে। প্রথম দুই বা তিন বছররের সঠিক কঠোর পরিশ্রম আপনাকে যে একসময় কোথাই নিয়ে যেতে পারবে, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না ।

লেখক: শেফ জেভিয়ার