সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঠিকাদার ব্যবসা করতে গিয়ে কোটি টাকার ওপরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন খায়রুল ইসলাম সোহাগ। ঋণের চাপে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তার ওপর একমাত্র ছেলেসন্তানও ছিল বিশেষ প্রকৃতির (অটিস্টিক)। এসব কারণে হতাশার চাপ মুক্তির জন্যই সোহাগ হয়ে ওঠেন আত্মঘাতী। স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে একমাত্র সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজেও বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।
প্রাথমিক তদন্তের পর গতকাল বৃহস্পতিবার তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা এমন ধারণা করেছেন। তবে নিহতদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে না আসা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি তারা।
গত বুধবার সন্ধ্যার পর রাজধানীর মগবাজারের নয়াটোলার ১৮১/ডি নম্বর ভবনের পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটে বুধবার দুপুরে বাবা-ছেলের ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। ঘটনার সময় সোহাগের স্ত্রী নাজমুন নাহার নূপুর বাসায় ছিলেন না। বাজার করে ফিরে তিনি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ পান। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করার পরও স্বামী-সন্তানের সাড়া না পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে বিকল্প চাবি দিয়ে দরজা খুলে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে স্বামী ও সন্তানের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তীব্র হতাশা থেকে প্রতিবন্ধী ছেলেকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজেও গলায় ফাঁস দেন ঠিকাদার খাইরুল ইসলাম সোহাগ। ঠিকাদারি কাজে মোটা অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েন তিনি। এরপর থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। আবার ছেলে শাহারাত ইসলাম আরিন অটিস্টিক। সব মিলিয়ে চরম হতাশ ছিলেন সোহাগ। মাঝেমধ্যে স্ত্রীকেও আত্মহত্যার কথা বলতেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে ছেলেকে শ্বাসরোধে হত্যার পর বাবা আত্মহত্যা করেন। তারপরও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন সোহাগ। সেই হতাশা থেকেই এমন আত্মঘাতী হয়ে ওঠেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঠিকাদার ছিলেন ৫৫ বছর বয়সী খাইরুল ইসলাম সোহাগ। তবে কাজ করতে গিয়ে কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েন তিনি। সেই ক্ষতি আর পুষিয়ে উঠতে পারেননি। এতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এজন্য তাকে চিকিৎসাও দিতে হয়। সেই সঙ্গে তার নানারকম শারীরিক সমস্যাও ছিল। কয়েক মাস ধরে তিনি বাসাতেই থাকতেন। উপার্জন না থাকায় তাকে অনেক টাকা ঋণ নিতে হয়। তারপরও বাসাভাড়া বাকি পড়েছিল। আর্থিক সংকট, শারীরিক-মানসিক সমস্যা এবং প্রতিবন্ধী ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাকে সবসময় গ্রাস করে থাকত। এসবের জের ধরে বুধবার তিনি স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে ছেলেকে হত্যা করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি তাদের মৃত্যুর পেছনে সম্ভাব্য অন্যান্য কারণও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ছেলেকে শ্বাসরোধে হত্যার পর ফ্যানের রশিতে ঝুলিয়ে রাখার কারণও খুঁজছেন তারা।