কেউ তাকে বলেন ক্রাফটম্যান। কেউ বলেন ডেস্ট্রয়ার। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট আসলে ‘টু ইন ওয়ান’। উইকেটকিপার হিসেবে তিনি হস্তশিল্পী। আর ব্যাটসম্যান হিসেবে বিধ্বংসী।
গিলক্রিস্টকে জয়ের ক্ষুধায় তেতে থাকা ভয়ডরহীন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের প্রতীকও বলা যায়। প্রথমে নামলেও তিনি অস্ট্রেলিয়ানিজমের ধারক। সাতে নামলেও তাই। সাদা বা রঙিন পোশাকে গিলক্রিস্টকে আলাদা করা যায় না। সবসময়, সব পরিস্থিতিতে তিনি ‘জাস্ট হিট দ্য বল’ মনোভাবে ব্যাট করতেন। কোনোদিন কপিবুক ক্রিকেট খেলেননি। হাই-অন-দ্য-হ্যান্ডেল গ্রিপ নিয়ে এমনভাবে ব্যাট করতেন যে মনে হতো হাতুড়ি চালাচ্ছেন। প্রাচ্যের মতো কব্জির মোচড় তার ছিল না। কিন্তু স্কোর বোর্ডে বন্যার বেগে রান উঠতে থাকলে গিলক্রিস্টের কার্যকারিতা বোঝা যেত। টেস্টে প্রতি ১০০ বলে ৮১ রান করেছেন। ওয়ানডেতে সমানসংখ্যক বলে সেই রানটাই বেড়ে হয়েছিল ৯৬। স্যার ভিভ রিচার্ডস আর গিলবার্ট জোসেফের মতোই স্ট্রাইকরেট আর প্রভাবে গিলক্রিস্ট অন্যরকম।
২০০৪ সালে পুমার সঙ্গে ২০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের স্পন্সরশিপ চুক্তি করেন গিলক্রিস্ট। অজি উইকেটকিপারের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়িয়ে দেওয়া হলো বলে তখন কেউ কেউ সমালোচনাও করেন। ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনালে জবাব পেয়েছিলেন তারা। ব্রিজটাউনের ফাইনালে ১৪৫ রানের ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেন গিলক্রিস্ট। এরপর গিলির পেছনে আরও অনেক বিজ্ঞাপন সংস্থার লাইন দেখে পুমার দুশ্চিন্তা বেড়েছিল বলে শোনা যায়। আগের চুক্তির জন্য খুশিও ছিল তারা।
টেস্ট অভিষেকের আগে তার সামর্থ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন অনেকে। অভিজ্ঞ ইয়ান হিলি তখন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট কিপার। গিলি তো অত বয়সের নন। যদিও তিন বছর দাপটের সঙ্গে ওয়ানডে খেলে ফেলেছেন। অথচ ব্যাটিংয়ের ধরন দেখে আস্থা পাচ্ছিলেন না নির্বাচকরা। তবু পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৯৯ সালের ৫ নভেম্বরে ব্রিসবেনে সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথমবার সাদা পোশাকে মাঠে নেমেই বাজিমাত করেন গিলক্রিস্ট। প্রথম ইনিংসে তিন ক্যাচ ও এক রান আউটের পর ৮৮ বলে ৮১ করে শোয়েব আখতারের বলে বোল্ড হয়েছিলেন। তখনো সেরা ফর্মের ওয়াসিম আকরামকেও অবলীলায় ফ্রন্টফুটে খেলেছিলেন।
অভিষেকের পর টানা ৯ বছর টেস্ট খেলেছেন। একমাত্র অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ ছাড়া কেউ তাকে ভোগাতে পারেননি বলে মনে করা হয়। ২০০৫ সালের অ্যাশেজে ব্যর্থ ছিলেন গিলক্রিস্ট। পাঁচ টেস্টে ২৬, ১০, ৪৯*, ১, ৩০, ৪, ২৭, ১১ ও ২৩ রান করেন। ১৮ বছর পর অ্যাশেজ হারা আর নিজের ব্যর্থতা নিয়ে এতটাই বিরক্ত ছিলেন যে, ডায়েরিতে গিলক্রিস্ট লেখেন, ‘আই হেট দিস গেম।’ পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘অ্যাশেজ হার আমাকে খুব আহত করে। নিজেও ব্যর্থ হয়েছিলাম। মনের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছিল। নিজেকে প্রশ্ন করি, ছয় বছর এত রান পাওয়ার পর কি তবে ফুরিয়ে গেলাম? প্রথমবারের মতো নিজের প্রতি সন্দেহ জন্মেছিল। ওটাই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময়।’
ওই পাঁচের অ্যাশেজসহ টানা ১৫ টেস্টে কোনো সেঞ্চুরি পাননি গিলক্রিস্ট। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৪৪ রানের ইনিংস দিয়ে ফর্মে ফেরেন। ঘরের মাঠে ২০০৬ সালের অ্যাশেজে তিন ইনিংসে ব্যর্থ হন। যদিও দুটি হাফসেঞ্চুরি আর পার্থের অপরাজিত ১০২ রানের ইনিংস আরও বড় কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল। সেই ইঙ্গিতই ২০০৭ সালে ক্যারিবিয়ান বিশ্বকাপ ফাইনালে শ্রীলঙ্কার ওপর টর্নেডো হয়ে আছড়ে পড়ে। ১০৪ বলে ১৪৯ করেন গিলক্রিস্ট। ১৩ বাউন্ডারি আর ৮ ছক্কা মেরেছিলেন। সেদিন গ্লাভসের ভেতর স্কোয়াশ বল ঢুকিয়ে ব্যাট করতে নেমেছিলেন গিলক্রিস্ট।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ২৮৭ ওয়ানডেতে ৩৫.৮৯ গড়ে ৯৬১৯ রান করেছেন গিলক্রিস্ট। ১৬ সেঞ্চুরি আর ৫৫টি হাফসেঞ্চুরিও করেছেন। ৯৬ টেস্টে ওয়ানডের চেয়ে একটি সেঞ্চুরি (১৭) বেশি করেছেন গিলক্রিস্ট। হাফসেঞ্চুরি ২৬টি। ৪৭.৬০ গড়ে রান করেছেন ৫৫৭০।
গিলক্রিস্ট কত বড় ব্যাটসম্যান ছিলেন তা মাত্র তিনটি টেস্ট ইনিংস দেখলেই বোঝা যায়। একটা তিনি খেলেন পাকিস্তানের বিপক্ষে হোবার্টে। তার অপরাজিত ১৪৯ রানে হারা টেস্ট জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গেও অপরাজিত ২০৪ রান করে হারা ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। আর পার্থে গিলক্রিস্টের ৫৭ বলের সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়াকে অ্যাশেজ ফিরিয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত ক্রিকেট ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান ছিলেন গিলক্রিস্ট। যিনি কিপিংয়ে ৪৭২টি ডিসমিস না করলেও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে স্রেফ ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট খেলার যোগ্যতা রাখতেন। তার ৪৯তম জন্মদিনেও (১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর) এ তৃপ্তিটুকু কেউ কাড়তে পারবে না।