আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার জয়ী কিশোর সাদাত রহমানের বাড়ি নড়াইল জেলায়। সাইবার অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে তিনি ‘শিশুদের নোবেল খ্যাত আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।
তার এই কাজের পেছনে একটি ঘটনা তাড়না হিসেবে কাজ করেছিল।
সাদাত রহমান জানান, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে পিরোজপুরের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা তাকে নাড়া দেয়। দেশে এ ধরনের আরও ঘটনা ঘটছে।
এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৪৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী এ রকম সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। কিন্তু নিজেদের সমস্যা কাউকে বলতে পারে না তারা। পুলিশ তো দূরের কথা, অনেকেই নিজের মা-বাবাকেও এ ব্যাপারে কিছু জানায় না। শেষ পর্যন্ত অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
সাদাত আরও বলেন, এ ধরনের উপলব্ধি থেকে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া শিশু-কিশোরদের সাহায্য করতে অনলাইন প্লাটফর্ম সাইবার টিনসের যাত্রা শুরু করা হয় গত বছর অক্টোবর মাসে।
এই অ্যাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগী কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যোগাযোগ সৃষ্টি করা হয়।
প্রথমত, ভুক্তভোগীকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া হয়। অভিযুক্তকেও নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে বিষয়টি অপরাধ পর্যায়ে পৌঁছালে পুলিশ বিভাগকে জানানো হয়।
নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন (পিপিএম বার) এর সহযোগিতায় এই কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে।
নড়াইল আবদুল হাই সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ১৭ বছর বয়সী সাদাত রহমান ও তার দল সাইবার বুলিং ও সাইবার ক্রাইম থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষায় নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
সাদাত সম্পর্কে কিডস রাইটসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সাদাত একজন ‘তরুণ চেঞ্জমেকার’ ও সমাজসংস্কারক। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে এক কিশোরীর (১৫) আত্মহত্যার পর কাজে নামে সাদাত। তিনি তার বন্ধুদের সহায়তায় ‘নড়াইল ভলেন্টিয়ারস’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। সংগঠনটি বেসরকারি সংস্থা একশনএইডের ‘ইয়ুথ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ–২০১৯’–এ বিজয়ী হয়ে তহবিল পায়।
এই তহবিলের মাধ্যমে তারা ‘সাইবার টিনস’ মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে। এই অ্যাপের মাধ্যমে কিশোর –কিশোরীরা জানতে পারে কীভাবে ইন্টারনেট দুনিয়ায় সুরক্ষিত থাকতে পারে। প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিশোর –কিশোরী এই অ্যাপ ব্যবহার করছে। এই অ্যাপের মাধ্যেম ৬০টির বেশি অভিযোগের মীমাংসা হয়েছে এবং ৮ জন সাইবার অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে।
বর্তমানে সাদাত ‘সেফ ইন্টারনেট, সেফ টিনএজার’ নামের একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তিনি এবং তার বন্ধুরা ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্কুলে স্কুলে সেমিনার–, কর্মশালা করছে। প্রতিটি স্কুলে ‘ডিজিটাল স্বাক্ষরতা ক্লাব’ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন।
এদিকে আর্ন্তজাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার লাভ করায় নড়াইলসহ দেশব্যাপী আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। সামাজিক যোগাযাগ মাধ্যম ফেইসবুকসহ বিভিন্ন ভাবে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছে।
নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন খান নিলু এক বিবৃতিতে বলেন ‘ ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেন পিস এওয়ার্ড বিজয়ী সাদাত রহমানকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
জাতীয় ক্রিকেট তারকা ও নড়াইল-২ আসনের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা অভিনন্দন জানিয়ে তার ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘শিশুদের অধিকারের প্রচার এবং দুর্বল শিশুদের সুরক্ষায় জড়িত একটি শিশুকে প্রতি বছর "কিডস রাইটস ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস পিস প্রাইজ" প্রদান করা হয়।
সাদাত "সাইবার টিন্স" নামে একটি অ্যাপ্লিকেশন চালু করেছিলেন, যেখানে সাইবার বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তিরা তাদের মামলাগুলো রিপোর্ট করতে এবং সহায়তা পেতে পারেন। সাইবার টিন্সের সাথে তার কাজ তাকে ৪২টি দেশের ১৪২ জন মনোনীত দলের দলে দাঁড় করিয়েছেন।
এ বছর নড়াইলের সাদাত রহমানকে বিজয়ী করা হয়েছে। তোমার এই আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি নড়াইলের প্রতিটি মানুষের জন্য গর্বের এবং আনন্দের।