একই টেস্টে ফুটল শচিন-ওয়াকার ফুল

৩১ বছর আগের আজকের দিনে করাচিতে একই টেস্টে দুই ফুল ফুটেছিল। অভিষেক হয়েছিল ক্রিকেটের দুই কিংবদন্তির। ভারতের শচিন টেন্ডুলকার। পাকিস্তানের ওয়াকার ইউনিস। আরও দুজনের অভিষেক হয়েছিল সে ম্যাচে। কিন্তু শহীদ সাঈদ আর সলিল আনকোলা ওই এক টেস্টেই আটকে গিয়েছিলেন দুজনে। ক্রিকেট দুনিয়া সেদিন হয়তো উপলব্ধি করতে পারেনি যে দুই বিভাগের দুই নক্ষত্র একই দিনে নেমেছেন করাচিতে, যারা কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন ক্রিকেট ইতিহাসের।

১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর দুই কিশোর মাঠে নেমেছিলেন। শচিন টেন্ডুলকারের বয়স ছিল ১৬ বছর ২০৫ দিন। ওয়াকারের ১৭ বছর ৩৬৪ দিন। সেদিন থেকেই শচিন-ওয়াকার দ্বৈরথের শুরুটাও হয়েছিল। করাচিতে শচিন প্রথম আউট হয়েছিলেন ওয়াকারের বলেই। ১৫ রান করে পাকিস্তান কিংবদন্তির বিখ্যাত ইনসুইংয়ে ক্লিন বোল্ড হন শচিন। দুজনে মিলে ক্রিকেটকে যা দিয়েছেন তা এক কথায় অবিস্মরণীয়। শচিন খেলেছেন ২০০ টেস্ট, তাতে ৫১ সেঞ্চুরি ও ৬৮ হাফসেঞ্চুরিতে তার রান ১৫৯২১। আর ৪৬৩ ওয়ানডেতে ৪৯ সেঞ্চুরি ও ৯৬টি হাফসেঞ্চুরিতে করেছেন ১৮৪২৬ রান। ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৪৩৫৭ রানও শচিনের দখলে। সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা একমাত্র ব্যাটসম্যান তিনি এবং ওয়ানডেতে ২০০ করা প্রথম ব্যাটসম্যানের রেকর্ডও শচিনের দখলে। আর ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ংকর পেসার ওয়াকার ৮৭ টেস্টে ৩৭৩ উইকেট এবং ২৬২ ওয়ানডেতে ৪১৬ উইকেট নিয়েছেন।

করাচির সেই টেস্টের আগে ওয়াসিম আকরামের সঙ্গে ওয়াকারের বোলিং জুটির সম্ভাবনার কথা বলাবলি হচ্ছিল চারদিকে। সেই সঙ্গে ভারতের ১৬ বছর বয়সী স্কুল পড়ুয়া শচিনের নামটাও উচ্চারণ হচ্ছিল অনেক। সেই বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে ওয়াকার বলেন, ‘শচিনকে নিয়ে ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকেই আমি কথা শুনেছি। তারা বলছিল একজন স্কুলপড়ুয়া হয়েও স্কুল ক্রিকেটে সে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছে। আমি এটা শুনে একটু বিস্মিত হই। কারণ স্কুল ক্রিকেটে একটা সেঞ্চুরিই অনেক কিছু কিন্তু সেখানে ট্রিপল সেঞ্চুরি! সেই ছেলেটিই আমার অভিষেক টেস্টে খেলছে শুনে ওকে দেখার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। বলতে পারেন ওর বিপক্ষে বোলিং করার আগ্রহও বেড়ে যায়। কিন্তু প্রথম দেখায় ওকে দেখে আমরা পুরো পাকিস্তান দল বিস্মিত হয়ে যাই। ভাবছিলাম, এত ছোট ছেলে টেস্ট কী খেলবে! কিন্তু পরে বছরের পর বছর সে যা করেছে তা অবিশ্বাস্য। শচিনের সেই প্রথম ১৫ রানের ইনিংসে আমার বিপক্ষে একটি অন ড্রাইভ ও স্ট্রেইট ড্রাইভ দেখেই আমরা বুঝেছিলাম এ ছেলে অনেক দূর যাবে।’

আর নিজের অভিষেক টেস্টের ব্যাপারে শচিন টেন্ডুলকার বলেন, ‘ওই ম্যাচে ওয়াসিম আকরাম ছিলেন। তাকে আমি আগের বছরগুলোতে অনেক দেখেছি। বাউন্সার, ইনসুইং, আউটসুইং, ইয়র্কার সব করতে দেখেছি। তার বিপক্ষে মুখোমুখি হওয়া কঠিন ছিল। আমার প্রথম বলটি বাউন্সার দিয়েছিলেন তিনি। পরের বলের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। আমি তাকে যতদিন দেখেছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে বললাম পরের বলটা অবশ্যই ইয়র্কার হবে। কিন্তু সে আমাকে আবারও বাউন্সার দিল। এরপরে আমি বললাম তৃতীয় বলটা অবশ্যই ইয়র্কার হবে কিন্তু সেই বলেও সে বাউন্সার দিল। এরপরে চতুর্থ বল, সেই ওভারের শেষ বল ছিল। আমি নিজেকে বললাম এটা অবশ্যই ইয়র্কার হবে কারণ এটার জন্যই সে পরিচিতি। কিন্তু চতুর্থ বলেও সে বাউন্সারই দিল। এরপর নিজেকে বললাম এটাই আসলে টেস্ট ক্রিকেট। এখানে নিজে যা ভাবব তা হবে না। কী সামনে আসছে সেটা দেখে খেলতে হবে।’ ওই ম্যাচ থেকে শিক্ষার ব্যাপারে শচিন আরও বলেন, ‘সেই ম্যাচেই আমার জীবনে প্রথমবার জেনুইন পেসারদের বিপক্ষে মুখোমুখি হই। ওয়াকারের কিছু বল আমার ব্যাট চালানোর আগেই চলে যাচ্ছিল। এরকম একটি বল শেষে আমি নিজেকে বললাম, বলের মেরিট অনুযায়ী খেলতে হবে। বল না দেখে ব্যাট চালানোর কোনো মানেই হয় না। এটাও আমার একটা শিক্ষা ছিল।’ 

ততদিনে তারকা হয়ে ওঠা বোলার ওয়াসিম আকরাম বলেন, ‘খেলার আগে শচিনকে নিয়ে খুব কথা হচ্ছিল। আমরা ভাবলাম কী আর হবে সে তো ছোট ১৬ বছরের একটা ছেলে। আর সামনাসামনি আমি ও ওয়াকার যখন ওকে দেখলাম, দেখতেও সে ছোটখাটো ছিল। ভাবলাম ওকে তো আমরা সহজেই ম্যানেজ করে নেব। যখন ম্যাচে সে নামল সেই করাচিতে প্রথম টেস্টে। আমি ভাবলাম ওকে অবশ্যই বাউন্সার দেব। ছোটখাটো আছে বাউন্সারে সে অবশ্যই ঘাবড়ে যাবে।’

করাচি টেস্টে পাকিস্তান দলের অধিনায়ক ইমরান খান শচিনের ব্যাপারে বলেন, ‘শুরুতে ওকে দেখে তো আমি ভাবলাম এই বাচ্চা কী খেলবে, এত ছোট। ওকে দেখতে এতটাই ছোট লাগছিল, কাঁধ ছোট, কোমর ছোট, উচ্চতায়ও ছোট। ওর কি সাহস হবে ওয়াসিম-ওয়াকারকে খেলার। আসলে ওয়াকার ও ওয়াসিমকে আলাদা করে বলে দিতে হয়নি যে বাউন্সার করো। শচিনকে দেখেই তারা বাউন্সার দেওয়ারই সিদ্ধান্ত নেন। সব বোলারের কাছেই যেসব হাতিয়ার থাকে তার মধ্যে সেরা হলো বাউন্সার। এটা দিয়ে ব্যাটসম্যানকে পরীক্ষা করা হয়, ব্যাটসম্যানের মধ্যে টেকনিক আছে কি না, সাহস আছে কি না। ওই সময় যখন ভারতে তেমন পেসার ছিল না ওই সময়ে ওয়াসিম-ওয়াকারের মতো পেস বোলারদের সামনে দাঁড়ানোটাই শচিনের একটা আলাদা পরীক্ষা জয় বলা যায়।’ শচিন সম্পর্কে ইমরান খান আরও বলেন, ‘শচিনের দারুণ যে বিষয়টা ছিল তা হলো ওর টাইমিং। আমি বলব সে যেভাবে টাইমিং করত এটা অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে ওর উপহার।’

শচিন-ওয়াকারের এই দ্বৈরথ থামে ২০০৩ বিশ্বকাপে। টুর্নামেন্টে দক্ষিণ আফ্রিকার সেঞ্চুরিয়নে মুখোমুখি হয়ে ৯৮ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছিলেন শচিন। সেই ইনিংসে ওয়াকারের বিপক্ষে ২৭ রান করেন। বিশ্বকাপের পরই অবসর ঘোষণা করেন ওয়াকার। এতে ব্যাট-বলের রোমাঞ্চকর এক লড়াইয়ের ইতি হয়।