পাঁচ দশক ধরে মঞ্চ, রেডিও, টিভি ও চলচ্চিত্রে সরব ছিলেন আলী যাকের। অভিনেতা হিসেবেই তার পরিচিতি বেশি। যদিও লেখা-নির্দেশনায় ছিলেন বরাবরই। শেষ চার বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছিলেন। অনেকটা আড়ালে চলে গেলও ঠিকই অভিনয়কে মিস করতেন আলী যাকের।
শক্তিমান এ অভিনেতা এক একটি চরিত্রকে যেভাবে জীবন্ত করে তুলেছেন তা অতুলনীয়। অভিনয়টা হৃদয় দিয়ে ধারণ করেছেন বলেই হয়তো তিনি এতই সাবলীল প্রতিটি চরিত্রে। শেষ সময়েও ছিল অভিনয়ের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
দু’বছর আগেও তাকে মঞ্চে গ্যালিলিও নাটকে দুর্দান্ত অভিনয় করতে দেখা গেছে।
গত কয়েক বছরে নিজের মতো করেই সময় কাটাতেন আলী যাকের। করোনাকালে অনলাইনে খবর পড়তেন, টিভি দেখতেন। শুনতেন যৌবনকালের প্রিয় গানগুলো। তালিকায় ছিল হেমন্ত মুখার্জি, মান্না দে, কিশোর কুমার, মোহাম্মদ রফি, মানবেন্দ্র মুখার্জির গান। বই পড়তেন, ইউটিউবে নাটক দেখতেন।
গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতি তার দুর্বলতা আগের মতোই ছিল। গত ৭ নভেম্বর জন্মদিনের পরদিনই সেখানে ছুটে গেছেন স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে। যাওয়ার পথে গাড়িতে থাকা অবস্থায় সারা যাকের দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, “গ্রাম তার খুব প্রিয়। আমিও খুব ভালোবাসি।”
দক্ষ অভিনেতা না হলে হয়তো আলী যাকেরকে মানুষ এভাবে হৃদয়ে স্থান দিতেন না। সেই অভিনয় থেকে এখন তিনি দূরে। কতটা মিস করেন, জানতে চাইলে তখন বলেন “প্রচণ্ড মিস করি।” সারা যাকের বলেন, “সত্যি অভিনয়টা মন থেকে ভালোবাসেন। ভালো অভিনেতাদের অভিনয় তো বটেই, ইন্টারভিউ পর্যন্ত ইউটিউবে সময় করে দেখেন। বুঝতে চেষ্টা করেন এখনকার প্রজন্ম অভিনয় নিয়ে কী ভাবছে? আমাদের অভিনয় জগৎ কোন দিকে যাচ্ছে? শরীর সায় দিলে তিনি আবারও অভিনয় করতে চান।”
১৯৪৪ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এ নাট্যব্যক্তিত্ব। আলী যাকের ছিলেন চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয়। তার বাবা মোহাম্মদ তাহের ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বাবার চাকরির বদলি সূত্রে অল্প বয়সে কুষ্টিয়া ও মাদারীপুরে কাটান আলী যাকের।
তিনি নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
আলী যাকের ৮ নং সেক্টরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
১৯৭২ সালে তিনি মঞ্চনাটকের দল আরণ্যকে যোগদান করেন। নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর বিখ্যাত ‘কবর’ নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম মঞ্চে ওঠেন। পরবর্তীতে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে যোগদান করেন। সেখানে তার অভিনীত ‘দেওয়ান গাজির কিসসা’, ‘নুরুল দিনের সারাজীবন’ দেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।
টেলিভিশন নাটকে ‘আজ রবিবার’ ও ‘বহুব্রীহি’ দিয়ে তিনি পরিচিত লাভ করেন।
আলী যাকের একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক, বঙ্গবন্ধু পদক, মুনির চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ একাধিক সম্মাননা পান।