ম্যারাডোনা শিরোপাটা ছিনিয়েই নিল

আমি ইন্তার মিলানে গেলাম ১৯৮৮তে। এর দুই বছর আগের ঘটনা। শনিবারের এক রাতে মিউনিখে দুই-তিনজন লোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো। ওরা এসেছিল নাপোলি থেকে।

আমি তখন বায়ার্ন মিউনিখে খেলি। কোলনের বিপক্ষে আমাদের একটা ম্যাচ ছিল। সেটা খেলে শহরে ফিরতে রাত ৯টা কি ১০টা বেজে যায়। আমার ম্যানেজার এবং নাপোলি থেকে আসা লোকজন একটা ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করছিল। রেস্টুরেন্টটা আমার বন্ধুর। শনিবার রাতে সাধারণত ওটা বন্ধই থাকত। সেদিন আমাদের জন্যই খোলা রাখে কারণ অভ্যাগতরা একান্তে কথা বলতে চেয়েছিল।

নেপলস থেকে আসা অতিথিরা কোনো ভণিতা করেনি। আমাকে সরাসরি বলে, ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা আপনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একই দলে খেলতে চান।’ এরপর তারা নাপোলিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

আমাকে নগদ অর্থ আর তিন বছরের চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। টেবিলের ওপর একটা ব্যাগে ক্যাশ ছিল। জার্মান মুদ্রায় ১ মিলিয়নের মতো হবে। ওটা তারা স্যালারি হিসেবে নয়, দিতে চেয়েছিল শুধু চুক্তিতে রাজি করানোর জন্য। বেতনের কথা শুনে তো আমার মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। বায়ার্নে যা পেতাম তার তিন গুণ দিতে চেয়েছিল ওরা। যদিও আমার বিশ্বাস হয়নি। আমি পরিচ্ছন্ন স্বভাবের লোক। স্যালারি বেশি মনে হয়েছিল। নিজেকে প্রশ্ন করলাম নাপোলিতে যেতে রাজি কিনা? ক্লাব ছাড়ার এটাই কি ঠিক সময়? যা হোক সব দিক বিবেচনা করে আমি প্রস্তাবটা ছেড়ে দিলাম। কিন্তু মনে একটা দারুণ অনুভূতি রয়ে গেল এই ভেবে যে, ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তি আমার সঙ্গে এক দলে খেলতে চান।

বিরাশিতে প্রথম দেখা হওয়ার পর থেকে আমি আর ম্যারাডোনা পরস্পরকে খুব শ্রদ্ধা করতাম। জার্মানির হয়ে ওটা ছিল আমার চতুর্থ ম্যাচ। স্পষ্ট মনে আছে ২৪ মার্চ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটা খেলি। ম্যারাডোনা আমার চেয়ে মাত্র কয়েক মাসের বড় ছিল। কিন্তু একুশেই ছিল সে সুপারস্টার। আমি সবে মাত্র জার্মানির হয়ে খেলা শুরু করেছি। দুজনের কোনো তুলনা হয় না। ম্যারাডোনা আমার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ছিল। সে ছিল আশির দশকের সেরা ফুটবলার। গতি, দক্ষতা, টেকনিক এবং ব্যক্তিত্ব মিলিয়ে ম্যারাডোনা ছিল পরিপূর্ণ। দারুণ একজন টিমম্যানও।

ছিয়াশির বিশ্বকাপে সে যা খেলেছিল ওরকম কর্তৃত্ব নিয়ে খেলতে কোনোদিন কাউকে দেখিনি। ফাইনালে আমার ওপর ভার পড়েছিল তাকে মার্ক করার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগোর অবিশ্বাস্য খেলা দেখে ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওয়ার বলেন, ‘জিততে হলে ম্যারাডোনাকে থামাতে হবে।’

শুরু থেকেই তাকে থামানোর কাজে মনোযোগী ছিলাম। বল ধরার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাকে আক্রমণ করছিলাম। যদিও বলে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাকে থামানো কঠিন ছিল। অন্যদের মতো আমি তাকে আঘাত করার চেষ্টা করিনি। যেভাবে মার্ক করার চেষ্টা করছিলাম তা দেখে দিয়েগো সম্মান করছিল। ফাইনালের ৭০-৮০ মিনিটে ম্যারাডোনা তেমন কিছু করতে পারেনি। যদিও আমরা ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিলাম। কাজেই শেষ ২০ মিনিটে আমাকে আক্রমণের দায়িত্বও নিতে হচ্ছিল। স্কোর ২-২ হওয়ার পর ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত পাস থেকে গোল করে বুরুচাগা আমাদের কাছ থেকে বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছিল।

নব্বই বিশ্বকাপ ফাইনালেও আমরা খেলেছি। আমি তখন রক্ষণ ছেড়ে আক্রমণের ভূমিকায়। সেই ম্যাচে জার্মানি জিতেছিল ১-০তে। সিরি আ-তেও আমি ম্যারাডোনার বিপক্ষে খেলেছি। ১৯৮৯ সালে ইন্তার মিলানের হয়ে লিগ শিরোপা জেতার সময় ফাইনাল খেলেছিলাম নাপোলির বিপক্ষে। আমার ঘরে এখনো একটা ছবি আছে। যেখানে আমি ফ্রি-কিক থেকে গোল করে উল্লাস করছি। আর পেছনে দাঁড়িয়ে ঘাসের দিকে চেয়ে আছে ম্যারাডোনা। একবার মাত্র আমরা একই দলে খেলেছি। ওটা ছিল মিশেল প্লাতিনির ফেয়ারওয়েল ম্যাচ। ফ্রান্সের বিপক্ষে রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ডের হয়ে ম্যারাডোনার পাসে আমি গোল করেছিলাম। ওটা আমার ফুটবল জীবনের সেরা স্মৃতিগুলোর একটি।

১৯৯২ সালে সেভিয়াতে যোগ দেয় ম্যারাডোনা। তখন বায়ার্নের হয়ে একটা প্রীতি ম্যাচ খেলতে গিয়েছিলাম। ম্যারাডোনার সঙ্গে পার্টিও করি। সারা রাত মাস্তি করেছিলাম। ম্যারাডোনা নাচছিল। সবার সঙ্গে কথা বলছিল। দেখে মনে হয়েছিল ইউরোপে ফিরে সে খুশি আছে। এরপর যতবার আমাদের দেখা হয়েছে খুব আড্ডা দিয়েছি। শেষবার দেখা হয়েছিল রাশিয়া বিশ্বকাপের সময়। ম্যারাডোনাকে খুব দুর্বল লাগছিল। যা দেখে আমি মনে মনে কষ্ট পেয়েছিলাম। সে যখন নাপোলিতে খেলত তখন লোকের মুখে তার বিলাস-বৈভবের গল্প শুনতাম। আমার মনে হয় ম্যারাডোনা বলেই তার চারপাশে লোক ঘুরঘুর করত। কেউ তার বন্ধু ছিল না।     

ফুটবল মাঠে সে ছিল জাদুকর। আমার বিদায়ী ম্যাচ খেলতে সে মিউনিখে এসেছিল। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। আমিও তার বিদায়ী ম্যাচে আমন্ত্রিত ছিলাম। এটাই বলে দেয় আমাদের বন্ধুত্বের কথা। আমরা একে অপরকে শ্রদ্ধা করতাম।

* ফোর-ফোর টু ম্যাগাজিন থেকে অনূদিত