চুক্তি মেনে নাগরনো-কারাবাখের শেষ প্রদেশেও পৌঁছে গেল আজারবাইজানের সেনাবাহিনী। টাঙিয়ে দেওয়া হলো দেশটির জাতীয় পতাকা।
গত কয়েক দশক ধরে নাগরনো-কারাবাখ দখলে রাখে আর্মেনিয়া। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে এটি আজেরি ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত ছিল।
দীর্ঘ বিরোধের একপর্যায়ে এ বছরের সেপ্টেম্বরে শেষের দিকে তীব্র লড়াইয়ে দুই পক্ষের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পর রাশিয়ার মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয় সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশ দুইটি।
ডয়চে ভেলে জানায়, চুক্তি অনুসারে মঙ্গলবার নাগরনো-কারাবাখের সর্বশেষ অঞ্চল লাচিন প্রদেশে পৌঁছে যায় আজারি সেনারা। সেখানে আজারবাইজানের পতাকা টাঙিয়ে দেয়া হয়।
এদিন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘নতুন বাস্তবতার সূচনা হলো। এটা উদ্যাপনের সময়। বহু দিন ধরে প্রতীক্ষার পর সাফল্য অর্জন করেছে আজারবাইজান।’
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সই করা শান্তিচুক্তিতে বলা হয়, নাগরনো-কারাবাখের মূল তিনটি প্রদেশ বা অঞ্চল আগদাম, লাচিন এবং কালবাজার আজারবাইজানের হাতে সমর্পণ করতে হবে আর্মেনিয়াকে।
আর্মেনিয়ার সরকার এ চুক্তিতে সই করলেও তা প্রত্যাখ্যান করে দেশটির জনগণ। তাদের বক্তব্য, এর ফলে সব লাভই আজারবাইজানের হলো।
আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকল পাশিনিয়ানও সে কথা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু চুক্তি বদলের আর কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এরপর থেকে আর্মেনিয়াতে প্রবল বিক্ষোভ শুরু হয়। এমনকি পাশিনিয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টাও হয়।
এর মধ্যেই আর্মেনিয়ার এবং নাগরনো-কারাবাখের যোদ্ধারা এলাকা ছাড়তে শুরু করেন। নাগরনো-কারাবাখের ওই তিনটি অঞ্চল ফাঁকা করে দেওয়ার জন্য আর্মেনিয়াকে সময় বেঁধে দেয় আজারবাইজান।
আগদাম এবং কালবাজারে আগেই ঢুকে পড়েছিল আজেরি সেনা। মঙ্গলবার তারা পৌঁছে যায় লাচিনে। তাদের সঙ্গে লাচিনে পৌঁছেছিল রাশিয়ার সেনাও। শান্তিরক্ষায় এই মুহূর্তে নাগরনো-কারাবাখে প্রায় দুই হাজার রুশ সেনা মোতায়েন রয়েছে।
কৌশলগতভাবে লাচিন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। লাচিনের রাস্তা নাগরনো-কারাবাখের রাজধানীর সঙ্গে আর্মেনিয়ার যোগাযোগ স্থাপন করে। ফলে লাচিন আজারবাইজানের হাতে থাকার অর্থ, আর্মেনিয়ার সঙ্গে নাগরনো-কারাবাখের সরাসরি যোগাযোগ পথের উপর একটি বড় বাধা।
আজারি সেনা এখনো পর্যন্ত নাগরনো-কারাবাখের যে অঞ্চলেই ঢুকেছে সেখানেই দেখেছে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে সেখানকার আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষ পালিয়ে গিয়েছেন। লাচিনেও সেই একই ছবি দেখা গিয়েছে।
তবে সেখানে থেকে যাওয়া ৪৮ বছর বয়সী স্থানীয় মুদি দোকানদান জানান, নিজের বাড়ি ছেড়ে যেতে মন চায়নি তার। তাই থেকে গিয়েছেন। এতদিন ধরে তিলে তিলে তৈরি করেছেন দোকান, সংসার। যদি চলে যেতে হয়, তা হলে সব কিছু পুড়িয়ে দিয়ে যাবেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর দুটি স্বাধীন দেশে পরিণত হয় আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান।
তবে নাগরনো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে বিরোধ বাধে। এ নিয়ে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৯৪ সালে অঞ্চলটি দখলে নিয়ে নেয় আর্মেনিয়া।
যদিও নাগরনো-কারবাখ অঞ্চলটি আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের এলাকা হিসেবেই স্বীকৃতি ছিল।
ওই যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ মারা যায় এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। এই উদ্বাস্তুদের চাপ তৈরি হয় আজারবাইজানের ওপর। ২০১৬ সালেও অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিল। সেসময় অন্তত ২০০ জন নিহত হয়েছিল।
চলতি বছরের জুলাইয়ে সীমান্তে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াইয়ে কমপক্ষে ১৬ জন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে আজারবাইজানের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাও রয়েছেন। সেই উত্তেজনা পরবর্তীতে তীব্র সংঘাত রূপ নেয়।