ভাস্কর্যবিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। অন্যদিকে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ’ শিরোনামের একটি ব্যানার থেকে আয়োজিত পৃথক একটি প্রতিবাদ সমাবেশে পুলিশ বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আয়োজকরা।
গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অপরাজেয় বাংলা’র পাদদেশে আয়োজিত এক মানববন্ধনে ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিবাদ জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। মানববন্ধন থেকে ভাস্কর্যবিরোধীদের ‘পরাজিত শক্তি’ আখ্যা দিয়ে তাদের কঠোর হাতে দমন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, সৃজনশীল শিল্প প্রকাশের মাধ্যম হলো ভাস্কর্য। এটি মানুষের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে থাকে। যখন ভাস্কর্যবিদ্যা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন মানবিকতা বাধাগ্রস্ত হয়। সভ্যতাবিরোধী এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া বাঞ্ছনীয়। এদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, এ মৌলবাদী গোষ্ঠী ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ধর্মান্ধ এ গোষ্ঠী বাঙালির কৃষ্টির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বারবার পরাজিত হয়েছে। কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নয় এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক চেতনার বিরুদ্ধে হামলা। এরা একজনও একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়নি বরং বিরোধিতা করেছে। এদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহ বলেন, দুধ দিয়ে সাপ পোষা যায় না। তাদের ডিগ্রিকে সম্মান দেওয়া হয়েছে। তাদের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু দিনশেষে তারা খেলাফতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উন্মত্ত। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর আঘাত মানে বাংলাদেশের ওপর আঘাত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি।
মানববন্ধনে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান, অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন, অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ শিক্ষক সমিতির নেতারা।
অন্যদিকে গতকাল বিকেলে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে পুলিশের বাধার মুখে ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশ সংক্ষিপ্ত করা হয় বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন সমাবেশের অন্যতম আয়োজক রবিন আহসান। তিনি বলেন, ‘বিকেল ৪টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই পুলিশ এসে অনুমতিপত্র চায়। শাহবাগে সমাবেশ করতে নাকি অনুমতি নিতে হবে। আমাদের এটা জানা ছিল না। যেকোনো অন্যায়, অনাচারের বিরুদ্ধে শাহবাগে আমরা অতীতেও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি। কিন্তু এখন থেকে নাকি শাহবাগে সমাবেশ করতে অনুমতি নেওয়া লাগবে। এজন্য পুলিশ এসে আমাদের সমাবেশে বাধা দেয়। পরে আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে সমাবেশ করেছি।’ তবে রমনা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার এসএম শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাহবাগে ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে কোনো ধরনের সমাবেশ বা বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি।’
ভাস্কর্য ভাঙার উসকানিদাতাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়ে শাহবাগের সমাবেশে বক্তারা বলেন, দিনের পর দিন এই মৌলবাদী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা ধরেই তারা এখন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার সাহস পেয়েছে। এ দায় আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। মৌলবাদীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় আপস করা হয়েছে। সেই আপসের কারণেই এ মৌলবাদীরা এখন জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙার সাহস দেখায়। বাংলাদেশে বসবাস করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। এ দেশ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সেটা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ধর্ম নিয়ে এ দেশে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। ভাস্কর্য ভাঙার উসকানি যারা দিয়েছে, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে করে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে।
সমাবেশে বক্তব্য দেন রবিন আহসান, সঙ্গীত ইমাম, খান আসাদুজ্জামান মাসুম, আশরাফুল হক, জীবনানন্দ জয়ন্ত প্রমুখ।