শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) শাখা ছাত্রলীগ নেতার ‘ফাঁস হওয়া ফোনালাপে’ উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি এবং ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিনকে উলঙ্গ করে ছবি তুলে ক্যাম্পাস থেকে বের করার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে।
শাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান ও উপ-দপ্তর সম্পাদক সজীবুর রহমান সজীবের ফাঁস হওয়া ২৩ মিনিটের ফোনালাপ থেকে এ তথ্য জানা যায়। কয়েকদিন আগে এ ফোনাললাপ ফাঁস হয়। এ ফোনালাপ কয়েক মাস আগের বলে জানা গেছে।
ফোনালাপের প্রথমে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান, ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক সজীবুর রহমানকে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। ‘ফোন দিলে যেন ফোন ধরে’ এ কথাও বলেন এবং একাডেমিক ভবনে নির্মাণাধীন লিফটের খবর নিতে বলেন সজীবকে। ওই ফোনালাপে চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের ফোন না ধরার কথা আসে।
তখন ইমরান সজীবকে বলেন, ‘দেখা করে আকার-ইঙ্গিতে বলবি ফোন দিলে ফোন ধরেন না বিজি (ব্যস্ত) দেখান। যদি বলে ইমরান ফোন দিছিল আমি তো ফোন ব্যাক করতে পারিনি তখন দিবি ঝারি.....’।
ফোনালাপের ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের দিকে নির্মাণাধীন লেডিস হলের কথাও উঠে আসে এবং সেখানে মোস্তফা কামালের (সেন্টার অব এক্সিলেন্সের ঠিকাদারী পক্ষ) কথা বলা হয় এবং তার নম্বর আছে কি-না জানতে চান ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক।
এরপর ৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের দিকে ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মৃন্ময় দাস ঝোটন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিলের নাম উল্লেখ করেন সজীব। সেখানে ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজি এবং টাকা নেয়ার কথা জানা যায়।
‘আমারে (খলিল) ভাই ডাকাইছে মানে? আমি যদি না আসি...., আর টেন্ডারবাজি করো তোমরা ছয়জনে, দোষ হয় আমাদের। আমরা কি করছি?’ খলিল ঝোটনকে এভাবে বলেছিল বলে সাধারণ সম্পাদককে জানায় সজীব।
তিনি ইমরানকে ফোনালাপে আরো জানান, এ ছাড়া খলিল ঝোটনকে বলেছিল, ‘তুমিই তো কালকে কইছো টাকা পাইছে ১৫ লাখ’। এই টাকা পাওয়ার কথা গেস্টরুমে ঝোটন বলেছিল বলে উল্লেখ করেন সজীব।
আলাপে সাধারণ সম্পাদক ৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের দিকে জুনিয়রদের ছাত্ররাজনীতি থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অধিকারের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘তারা এতদিন ধরে পলিটিক্স করছে। তাদের রাইট (অধিকার) আছে না ফাইন্যান্সিয়াল গেইনার (আর্থিক সুবিধা) হওয়ার?’
একই ফোনালাপে সজীব জানান, ছাত্রলীগের সহসভাপতি তারিকুল ইসলাম তারেক খলিলকে বলেছেন, ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্সে ডিল (চুক্তি) করার পরে সে আর কোথাও ডিল করবে না’।
অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির কথা উঠলে সজীব জানায়, ‘সভাপতি না-কি ঢাকায় গিয়ে কমিটি আটকে রাখছে। সভাপতিকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিতে চায় না বলে উল্লেখ করে সজীব। তখন সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘এটা করা যাবে না। তাকে গেস্টরুমে নিয়ে বিবস্ত্র করে ছবি তুলে ও ভিডিও করে রেখে দিয়ে আসসালামু আলাইকুম বলে বিদায় করে দিবে....’।
কোনো এক সময় ভারপ্রাপ্ত সভাপতিকে ‘জুতার বাড়ি দিয়ে ভিডিও করে রেখেছেন’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শেষের দিকে সাধারণ সম্পাদক সজীবকে সবগুলো সাইটে গিয়ে গাছপালার হিসাব করতে বলেন এবং বলেন, ‘ওদের কথা শুনিস না। ওদের কথা শুনলে জলে ডুবতে হবে’।
এরপর ২০ মিনিট ১২ সেকেন্ডের দিকে তিনি আরো বলেন, ‘এখন যদি প্রেশার ক্রিয়েট (তৈরি) করতে না পারিস তাহলে সেন্টার অফ এক্সিলেন্সের না, টেন্ডার অফ শাহজালাল ইউনিভার্সিটির ১২ শ কোটি টাকার..... (অস্পষ্ট কথা)’। এখন প্রেশার ক্রিয়েট করতে না পারলে তারা মাইনাস হয়ে যাবে বলে সজীবের কণ্ঠে এই কথা শোনা যায়।
সাধারণ সম্পাদক পরে বলেন, ‘এখন পিছনে আসার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু খলিল এবং মামুনকে সামনে রাখ’। তিনি একদম শেষে বলেন, ‘ভবিষ্যতে কাজগুলো তোদের কাছে কীভাবে যায় সরাসরি সেই ব্যবস্থা করতেছি এবং তুই (সজীব) ডোপ টেস্টটা করে ফেল তাড়াতাড়ি’।
ফোনালাপের বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান খানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সজীবের অপহরণকারী ছাত্রদল ক্যাডাররা তার কাছ থেকে মোবাইল তিন মাস আগে ছিনিয়ে নিয়েছিল, সেখান থেকে দীর্ঘদিনের অনেকগুলো অডিও কেটে জোড়া লাগিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। অলরেডি এটার বিরুদ্ধে একটা মামলা চলমান আছে। সজীব আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল, সজীব এখনও অসুস্থ, সুস্থ হলে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে’।
তিনি বলেন, ‘অডিও রেকর্ডটা ভালো করে শুনে বলেন, কোথায় আমি চাঁদাবাজির কথা বলেছি? যে কারো চাঁদাবাজির বিপক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবশ্যই পদক্ষেপ নেয়া দরকার। পাশাপাশি কাউকে অপহরণ করে মোবাইল নিয়ে নিলে তারও ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আর ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক কর্মসূচির কোনো ফান্ড থাকলে সেটার স্বচ্ছতা থাকাও জরুরি’।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে শাখা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিনকে ফোনে দেওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ ঘটনায় সজীবকে কয়েকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। তবে ২ ডিসেম্বর সজীব ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দাবি করেন তার ছিনতাই হওয়া ফোনালাপ থেকে কাথা কেটে জুড়ে দিয়ে এ অডিও তৈরি করা হয়েছে। এসব কারণে তিনি আত্মহত্যারও হুমকি দেন।
গত সেপ্টেম্বরের শেষে সজিবুর রহমান ও কর্মী তারেক হালিমীকে অপহরণের পর উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দু’জনকে আটক করে পুলিশ। তারা হলেন, অভ্র কুমার দাস ও মুন্না কোরায়েশি। তারা কেউ শাবিপ্রবির ছাত্র নন। এদের মধ্যে অভ্র মাদক কারবার এবং মুন্না শহর ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।