চলে গেলেন ’৮২ বিশ্বকাপজয়ী পাওলো রসি

ফুটবল দুনিয়ায় এ যেন বিদায়ের মিছিল। ২৫ নভেম্বর পরলোকে পাড়ি জমালেন ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনা। এরপর ২৯ নভেম্বর মারা যান আরেক বিশ^কাপ তারকা সেনেগালের পাপা দিউপ। দুদিন আগে একই পথ ধরলেন আর্জেন্টিনার সাবেক ফুটবলার ও বিশ্বকাপ দলের কোচ আলেহান্দ্রো সাবেলা। আর ৯ ডিসেম্বর রাতে মাত্র ৬৪ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন আরেক ফুটবল কিংবদন্তি, ইতালির ১৯৮২ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক পাওলো রসি।

ইতালির ফুটবল ইতিহাসের মহানায়ক বলা চলে পাওলো রসিকে। ১৯৮২ সালের ১১ জুলাই রসির অনবদ্য পারফরম্যান্সেই তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল রোমানরা। ওই আসরে ব্রাজিলের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনাল গ্রুপ ম্যাচে শতাব্দীর সেরা ম্যাচ উপহার দিয়েছিলেন রসি।

প্রথম পর্বের ছয় গ্রুপের সেরা ১২ দলকে চার গ্রুপে ভাগ করে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা হয় সেবার। প্রথম পর্বে পোল্যান্ড, ক্যামেরুন, পেরুর সঙ্গে তিন ড্র নিয়ে কোনো রকমে দ্বিতীয় পর্বে ওঠে ইতালি। গ্রুপ সঙ্গী হয় ব্রাজিল ও আগের বারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারায় দিনো জফের ইতালি। ৫ জুলাই বার্সেলোনার সাররি স্টেডিয়ামে ইতালি-ব্রাজিল গ্রুপের শের্ষ ম্যাচ পরিণত হয় ফাইনালে। আগের চার ম্যাচ নি®প্রভ রসি হ্যাটট্রিক করে (৩-২ গোল) ইতালিকে তুলে দেন সেমিফাইনালে। সেই থেকে ফুটবল লোকগাথায় তার নামের পাশে যুক্ত হয়ে যায় ম্যাচটি। একই সঙ্গে ১৯৮২ বিশ্বকাপও। রসির নাম উঠলেই বলা হয়  ‘দ্য ম্যান হু মেড ব্রাজিল ক্রাই’ (যিনি ব্রাজিলকে কাঁদিয়েছিলেন)। তাকে বলা হতো ‘বেবি ফেসড অ্যাসাসিন’ (শিশুসুলভ চেহারার খুনে)। পরে পোল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে জোড়া গোল করে ইতালিকে ফাইনালে তোলেন রসি। এরপর পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ফাইনালে ইতালির ৩-১ গোলে জেতা ম্যাচে প্রথম গোলটিও তার। আসরে ছয়টি গোল করেছিলেন রসি। ইতিহাসে এক বিশ্বকাপে ট্রফি, গোল্ডেন বল (সেরা খেলোয়াড়) ও গোল্ডেন বুট (সেরা গোলদাতা) জেতা মাত্র তিন ফুটবলারের একজন তিনি। অসাধারণ ওই বিশ্বকাপের জন্যই ১৯৮২ সালের বর্ষসেরার (ব্যালন ডি’অর) পুরস্কার জিতেছিলেন রসি। ক্যারিয়ারে ইতালির হয়ে ৪৮ ম্যাচে ২০ গোল করেছিলেন জুভেন্তাস, এসি মিলানের হয়ে খেলা এই কিংবদ্ন্তি। 

এক সাক্ষাৎকারে ১৯৮২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ম্যাচটির কথা উল্লেখ করে রসি বলেছিলেন, ‘আমার জন্য সেই বিশ্বকাপটা সত্যিকার অর্থেই সবদিক থেকে ব্যতিক্রম। দেশ হিসেবে ইতালির ইতিহাসে এক স্মরণীয় মুহূর্তে সেই সাফল্য এসেছিল। সামাজিক দিক থেকেও আমরা তখন ভারসাম্যপূর্ণ একটি দেশ। বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক নেতা সান্দ্রো পেরতিনি তখন দেশের প্রেসিডেন্ট আর কোচ হিসেবে এনজো বেরজো। তারা দুজনই আমার চোখে দারুণ মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ। আমার তো মনে হয় ২০০৬-এর বিশ্বকাপ জয়ের চেয়েও ইতালির মানুষ ১৯৮২’র সাফল্যকে বেশি মনে রাখে। ওই সময়ই বেশি মানুষ উৎসব করতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। টুর্নামেন্টের মধ্যকার সেরা স্মৃতি বলতে আমার কাছে অবশ্যই ব্রাজিলের বিপক্ষে জেতা ম্যাচটি। আমার চোখে সেটা শতাব্দীর সেরা ম্যাচ। ম্যাচটি আমাদের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খুব আবেগের বিষয় হয়ে ওঠে। অবশ্যই এটা আমার ক্যারিয়ারেরও সেরা মুহূর্ত। এরপর অবশ্যই পছন্দের তালিকায় থাকবে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে করা আমার প্রথম গোল। ওই গোলটিই সম্ভবত আমার প্রতি মানুষের অনুরাগ বাড়িয়ে দেয়। আর অবশ্যই সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামে আমাদের শিরোপা জয়ের পর ইতালির পতাকা ওড়ার দৃশ্য আমার চোখে ভাসে। আমরা কোটি মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছি, বিশেষ করে আমি এমনটা ভাবতে আমাদের এবং আমার সত্যি ভালো লাগছিল। ইতালির জার্সি গায়ে দেওয়ার সময় আমার প্রতিবারই দারুণ এক অনুভূতি হতো, নিজের ভেতর দায়িত্ববোধ ও গুরুত্ব ভাব জেগে উঠত। আমার মনে হতো জাতীয় দলকে কখনই না বলা যায় না, এক পা নিয়ে হলেও আমি জাতীয় দলে খেলব।’

১৯৮২ বিশ্বকাপ নিয়ে ইতালি ফুটবলপ্রেমীদের আলাদা ভালোলাগা আছে। কারণ, সেবার ৪৪ বছর পর বিশ্বকাপ জিতেছিল তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত ভুলতে ইতিহাসের সবচেয়ে আনন্দময় দিন কাটিয়েছিল তারা সে বছরের ১১ জুলাই। তাই সেই বিশ্বকাপ অনেক ইতালিয়ানের জীবনের অংশ। সেই সঙ্গে পাওলো রসিও বিশ্বকাপজয়ী নায়ক হিসেবে তাদের জীবন-গল্পের অংশ হয়ে যান। অপর একটি সাক্ষাৎকারে পাওলো রসি তার প্রতি মানুষের ভালোলাগার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলেন এভাবে, ‘সড়কে এমন অনেকবার হয়েছে যে মানুষ এসে আমাকে থামিয়ে দিচ্ছে শুধুমাত্র ১৯৮২ ব্রাজিল ম্যাচটি নিয়ে কথা বলবে বলে। ইতালিয়ানদের কাছে ওই ম্যাচটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। বেশিরভাগ সময়ই তারা আমাকে থামিয়ে তাদের গল্প বলত, ওই ম্যাচের দিন তারা কীভাবে দেখেছে, তারা সেই ম্যাচটি নিয়ে এখনো কী ভাবে ইত্যাদি। তারা সব সময়ই আমাদের শুভেচ্ছা জানায় ওই ব্রাজিল ম্যাচের জন্য। আমার সত্যি ভাবতে ভালো লাগে যে, মানুষের জীবন ইতিহাসের বা গল্পের একটা অংশ হতে পেরেছি আমি। সত্যি আমি ১৯৮২ বিশ্বকাপের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে আছি। কিন্তু এটা আমি উপভোগ করি। আমি কিন্তু এমন ছিলাম না। আমি নিজেই একটা সমস্যা ছিলাম, খুবই একরোখা এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত মানুষ ছিলাম। কিন্তু এখন আমি জীবনের সবকিছুই উপভোগ করি।’