দেশের ফুটবল পেশাদার যুগে পা দেওয়ার আগে দু’বার প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র। পেশাদার লিগে টানা দু’বার রানার্স-আপও হয় তারা। এছাড়া তিনবার ফেডারেশন কাপ জয়ের মধ্য দিয়ে দেশের ফুটবলে মুক্তিযোদ্ধা একটা সময় আবির্ভূত হয়েছিল পরাশক্তি হিসেবে। কিন্তু কালের বিবর্তনে বিবর্ণ মুক্তিযোদ্ধার উজ্জ্বল অতীত। অর্থ সংকট এবং শীর্ষ কর্তাদের আন্তরিকতার অভাবে ফুটবল থেকেই হারিয়ে যাওয়ার জোগাড় দলটির। আসছে ফুটবল মৌসুমে খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে যে দলের সৃষ্টি, সেই দলটি বিজয়ের মাসেই হারিয়ে যাওয়ায় শঙ্কায় রীতিমতো ধুঁকছে। দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৩৫ ফুটবলার, দু’জন কোচের সময় কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়। এর-তার কাছ থেকে ধারকর্জ করে কিছু টাকা জোগাড় করে কোনোমতে চলছে আবাসিক ক্যাম্প। ক্লাব ও সতীর্থদের এই দুরবস্থা দেখে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি মুক্তিযোদ্ধায় খেলতে আসা জাপানিজ ফুটবলার ইউসুকে কাতো। দু’মৌসুম আগে এই দলের হয়েই ঢাকার মাঠে অভিষেক হয়েছিল এই মিডফিল্ডারের। গত মৌসুমে শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবে খেলার পর এবার মুক্তিযোদ্ধায় ফিরেই দেখছেন সংকট। তাই নিজের মতো করে উদ্যোগ নিয়েছেন স্পন্সর জোগানোর।
অথচ পেশাদার ফুটবলার হিসেবে বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় চাইলেই কাতো পারেন ফিফার কাছে নালিশ করতে। সে পথে না গিয়ে এবং নিজের উপার্জনের কথা না ভেবে উল্টো নিজ দেশের মানুষের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাহায্যের আহ্বান করেছেন। এরই মধ্যে ১০ হাজার ডলার অনুদানের একটা প্রতিশ্রুতিও পেয়েছেন। কাতো ফেইসবুকে ভিডিও পোস্ট করে বলেছেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা ৯ মাস লড়াই করেছে। সেই যুদ্ধে এদেশের ফুটবলাররা ফুটবল খেলে তহবিল সংগ্রহ করেছে। এই দলটির সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার গভীর সম্পর্ক আছে। তাই আমি দলটির জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। আমি স্পন্সর খুঁজছি তাদের জন্য যাতে দলটা টিকে থাকে। স্বাধীনতায় যাদের অবদান সেই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে এই দলের জন্ম, এটা ফুটবলে টিকে থাকবে না, এটা হতে পারে না। তাই দলের ম্যানেজারের ডাকে সাড়া দিয়ে আমি চেষ্টা করছি। দলের অনেকেই চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে রয়েছে। আমরা সবাইকে নিয়ে এই সংকট কাটিয়ে উঠব।’
মুক্তিযোদ্ধার চরম সংকটের শুরু গত বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর থেকে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র তাদের গুলিস্তানে অবস্থিত ক্লাবটিকে ভাড়া দিয়েছিল ‘ইনডোর গেম’ পরিচালনাকারী এক প্রতিষ্ঠানকে। ‘ইনডোর গেমের’ আড়ালে অবশ্য সেখানে বসানো হয় অবৈধ ক্যাসিনো। সেখান থেকে ভাড়া বাবদ বছরে চার-সাড়ে চার কোটি টাকা পেত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। সেই আয় দিয়ে ভালোভাবেই মাঝারি সারির একটি দল গড়তে পারত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু অভিযানে সেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া ২০১৭ সাল মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ ক্রীড়া চক্র চলছে প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে। বর্তমানে ক্লাবের দায়িত্বে আছেন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব মো. জহুরুল ইসলাম রোহেল। গত মৌসুমে দল গঠনে তার কিছু ভূমিকা থাকলেও এ বছর সেভাবে দলের খোঁজ নিচ্ছেন না এই কর্মকর্তা। ২ ডিসেম্বর উল্টো দলের ম্যানেজারকে জানিয়ে দেন তহবিল না থাকায় তার পক্ষে এ মুহূর্তে কিছুই করা সম্ভব নয়। এটা শুনেই ফুটবলারদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। দল নিয়ে রীতিমতো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছেন ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন সহকারী কোচ দস্তগীর হোসেন নীরা ও গোলকিপার কোচ আরিফুর রহমান পান্নুকে। তিনজন মিলে ধারকর্জ করে ক্যাম্প চালাচ্ছেন। আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘১২ নভেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত ক্যাম্পটা কীভাবে চলছে তার খোঁজ কি কেউ রেখেছে। ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন পাঁচবেলা খাওয়াদাওয়া করে। এতজনকে বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া করে রাখতে মাসে গুনতে হয় আড়াই লাখ টাকা। বাসার অগ্রিম টাকা, যাতায়াত, স্টাফদের বেতন, জার্সিসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি, অনুশীলন মাঠ ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ তো আছেই। নিজেদের জমানো টাকা এনে এখানে দিয়েছি। এছাড়া একজন ফুটবল সংগঠকের কাছ থেকে দুই বারে ১৫ লাখ টাকা এনে কোনোমতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। খেলোয়াড়দের একটা টাকাও দিতে পারিনি। তারপরও খেলোয়াড়রা আশায় বুক বেঁধে অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পিঠে হাত বুলিয়ে আর কতদিন পারব বুঝতে পারছি না। এ অবস্থায় একজন ভিনদেশি হয়েও কাতো চেষ্টা করছে দলের সংকটমোচনের। ওর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের উপদেষ্টা আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক অবশ্য যথেষ্ট আন্তরিক দলটির ব্যাপারে। দলের সংকট নিরসনে স্পন্সর জোগাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মন্ত্রী। ক্রীড়া চক্রের সভাপতি জহুরুল ইসলাম রোহেলকে অবশ্য একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। এমনকি সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে খুদে বার্তা পাঠানোর পরও কোনো সাড়া দেননি তিনি।