দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব দিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে নেতা-কর্মীদের তোষামোদী ছেড়ে মুখ খোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার শোকজের জবাব নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর বনানীতে নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব বলেন।
হাফিজ বলেছেন, ‘চিঠি পেয়ে অপমানিত বোধ করে পদত্যাগের কথাও ভাবছিলেন তিনি। তবে জবাব দেওয়ার পর শীর্ষ নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত তিনি নেবেন।
সম্প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকে দুই ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন ও শওকত মাহমুদকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ দর্শাতে বলা হয়। শওকত মাহমুদ বৃহস্পতিবার তার জবাব দেন। এর দুইদিন পর শনিবার নিজের জবাব পাঠিয়ে দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সামনে আসেন হাফিজ।
ভোলার লালমোহন-তমজুদ্দিন আসনে ছয়বারের সংসদ সদস্য হাফিজ ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রী ছিলেন। বীর বিক্রম খেতাব প্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর। ফুটবলার হিসেবেও দেশে খ্যাতিমান ছিলেন তিনি।
সাংবাদিকদের হাফিজ বলেন, ‘একজন যুদ্ধাহত, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বিজয়ের মাসে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে অসৌজন্যমূলক ভাষায় অসত্য অভিযোগ সম্বলিত কারণ দর্শানোর নোটিস পেয়ে হতবাক হয়েছি। আমার বিনীত অনুরোধ আমার বক্তব্য স্থায়ী কমিটির সদস্যের সামনে উপস্থাপন করা হোক। বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমাকে যদি দোষী সাব্যস্ত করা হয়, আমি যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আছি। আমি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি সর্বদাই শ্রদ্ধা পোষণ করি।’
রিজভীর চিঠিতে সৌজন্যের ব্যত্যয়: তিনি বলেন, দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাতে অনেক ভুল রয়েছে। এমনকি নামের বানানসহ অনেক ভুল রয়েছে চিঠিতে। আমি বিগত ২৯ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট, আমার যোগদানের তারিখ, ভাইস চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাবার তারিখ, আমার নামের বানানসহ অনেক ভুলই রিজভীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে দৃশ্যমান।
তিনি বলেন, ‘আমি ২২ বছর ধরে দলের অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছি। দলের ভাইস চেয়ারম্যানকে একজন যুগ্ম মহাসচিব (আদিষ্ট না হয়েও) এমন কঠিন, আক্রমণাত্মক ভাষায় কৈফিয়ত তলব করায় অত্যন্ত অপমানিত বোধ করছি। এখানে প্রটোকল ও সৌজন্যতার ব্যত্যয় ঘটেছে। ব্যক্তি রুহুল কবির রিজভী একজন ভদ্র, নিষ্ঠাবান ও ত্যাগী নেতা, তা সাথে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। তার কাছ থেকে এ ধরনের চিঠি আশা করিনি।’
পদত্যাগের ইঙ্গিত: হাফিজ বলেন, ‘আমার সামরিক বাহিনীর বন্ধুরা যাদের সাথে চাকরি-বাকরি করেছি, তারা সবাই এবং আমার ব্যক্তিগত বন্ধুরা যারা রাজনীতি করে না, তারাই সবাই বলে যে, আপনি আজকেই পদত্যাগ করেন। আমি চিন্তাও করেছিলাম। কিন্তু আমার প্রিয় নেতা-কর্মীরা সেই এখান থেকে আড়াইশ মাইল দূরে নদী পার হয়ে লঞ্চে, নৌকায়, মেঘনা নদীর পার থেকে এখানে এসে অনুরোধ করেছে- আপনি পদত্যাগ করবেন না, অবসর নেবেন না।’
তিনি বলেন, ‘তাদের অনুরোধে আজকে আমি পদত্যাগ করলাম না। আমি দেখতে চাই, এই আমার ব্যাখ্যা তাদের (নেতাদের) কাছে সন্তোষজনক হয় কি না। তারপরে আমি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
হাফিজের সঙ্গে ভোলার লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলার জাকির হোসেন, শাহাদাত হোসেন, বাবুল পাঞ্চায়েত, কবির হাওলাদার, ওমর ফারুক রিন্টু শতাধিক বিএনপি নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
কাউন্সিল দাবি: দলের কাউন্সিল দাবি করে হাফিজ বলেন, বিএনপির একজন নগন্য কর্মী হিসেবে কয়েকটি সুপারিশ পেশ করতে চাই। ২০২১ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই দলের জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করা হোক।
কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এবং সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনের দাবি জানান তিনি। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি বাণিজ্য এবং মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে আসায় তার তদন্তও দাবি করেন তিনি।
হাফিজ বলেন, ‘সম্প্রতি আমার নির্বাচনী এলাকায় ছাত্রদলের কমিটি কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকায় বসে গঠন করেছেন। আহ্বায়ককেই আমি চিনি না। ছাত্রলীগের কর্মীরাও এ কমিটিতে স্থান পেয়েছে। আমার সুপারিশ বিবেচনা করা হয়নি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে চিঠি দিয়ে কোনো উত্তর পাইনি।’
নেতাকর্মীরা তোষামোদী ছাড়ুন: নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাফিজ বলেন, ‘বিএনপি নেতাকর্মীদের চিন্তা করতে বলি, দেশের জনপ্রিয় দল বিএনপি কেন আজকে ক্ষমতার বাইরে? কারা এর জন্য দায়ী? চিন্তা করেন, মুক ও বধির না হয়ে চিন্তা করেন। দলকে ভালোর জন্য অবদান রাখুন। দলকে সাজেশন দেন, কী করা উচিত। কেবল তোষামোদ করে দায়িত্ব শেষ করবেন না।’
তিনি বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার নেতা জিয়াউর রহমান বলে গিয়েছেন, দলের চেয়ে দেশ বড়। আমার কাছেও আমার দেশ সবচাইতে বড়।’
আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত: হাফিজ বলেন, ‘এদেশে গণতন্ত্র আসুক আমি চাই। গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য, মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্যে, জনগনের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাবার জন্যে, বাকস্বাধীনতা ফিরে পাবার জন্যে এবং এই অবৈধ সরকারকে বিদায় করার জন্যে যে কোনো সংগ্রামে আমি সব সময় প্রস্তুত থাকব। আমি একজন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কর্মী। যদি বিএনপির নেতাকর্মীরা বিশেষ করে ছাত্র-যুবকেরা রাজপথে নামে, কালকে এ দলের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল।’
তিনি বলেন, ‘তারা রাজপথে নামে না কেন? অনেক চিন্তা করেছি। দলীয় নেতৃবৃন্দের উচিত এটা পর্যালোচনা করা যে, এত জনপ্রিয় দল বিএনপি ক্ষমতায় গেলে শতকরা ৮০ ভোট পায়, কিন্তু রাস্তায় কেন ১০০ লোক নামে না। এটা চিন্তা করা উচিৎ। অনেক কর্মীকে আমিও জিজ্ঞাসা করেছি। তারা বলে যে, আমি যদি নামি, গুলিটা খাই আমার পরিবারকে কে দেখবে? আমরা লাভটা কী? আমি জীবন দেব, অন্যরা সুবিধা হবে- এসব কারণে হয়ত নামে না। তবুও আমি বিএনপির সব নেতাকর্মীকে আহ্বান জানাব, আগামী দিনে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ডাক দিলে, যেই ডাক দেয়, আপনারা এসে এই সরকারকে উৎখাত করবেন।’
৫ পৃষ্ঠার জবাবে হাফিজ লিখেছেন, ‘বিএনপির সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে কোনো অসম্মানজনক, অসৌজন্যমূলক বক্তব্য রাখিনি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সততা ও দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক। আমি মুক্তিযুদ্ধে তার অধীনস্থ সেনা কর্মকর্তারূপে জীবনবাজী রেখে যুদ্ধ করেছি, সম্মুখ সমরে আহত হয়েছি। ১৪ ডিসেম্বর তারিখে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সারাদিনব্যাপী মরণপণ যুদ্ধের পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিলেট শহর দখল করেছিলাম’।
তিনি লেখেন, ‘২০২০ সলের এ দিনেই আমার দল আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আমাকে নোটিস পাঠানোর আগে চিঠির বিষয়বস্তু ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আমার কর্মীরা মর্মাহত হয়েছে।’
অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন দাবি করে হাফিজ লিখেছেন, ‘দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অসম্মান করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। জিয়া পরিবারের কোনো সদস্যের প্রতি কখনোই কটুক্তি করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। রাজনীতি ছেড়ে দিলেও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শ হৃদয়ে লালন করব।’
তার সম্পর্কে যেসব অভিযোগ ও অভিযোগের যে জবাব দিলেন: ১. আমাকে কখনো বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ২. জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটির আহ্বায়ক পদের অফার অসুস্থতার জন্য গ্রহণ করতে পারিনি। আমার বর্তমান বয়স ৭৬ বছর ২ মাস, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি কিংবা স্থায়ী কমিটিতে আমার চেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যা ৪ এর অধিক হবে না বলেই আমার ধারণা। ৩. দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সভায় যোগদানের আগেই পুলিশ আমাকে ঢাকা বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার করে, এ কারণেই বরিশালে যেতে পারিনি। আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল বর্তমান সরকার। বিএনপির কোনো সিনিয়র নেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের মারাত্মক অভিযোগ দায়ের করার কথা আমার জানা নেই। এ মামলা ছাড়াও এক ডজন মামলায় আমি গত দশ বছর ধরে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে যাচ্ছি।
৪/৫/৬. বর্ণিত দলীয় সভায় আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অতীতে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ মহান মুক্তিযোদ্ধের সঙ্গে জড়িত স্মরণীয় দিবসসমূহে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হতো, গত দেড় বছরে এ ধরনের অনুষ্ঠানেও দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি আমাকে ডাকার প্রয়োজন বোধ করেননি। বোঝাই যাচ্ছে বিএনপিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কোণঠাসা করে রাখার জন্য একটি মহল সক্রিয় রয়েছে। বিগত এক বছরে আমি জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ছয় সভায় অংশগ্রহণ করেছি, আয়োজক জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ২টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ২টি, বিএনপি ঘরানাভুক্ত সংগঠন ১টি। দেশের খ্যাতনামা মুক্তিযোদ্ধারা এই সভাগুলোতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অসৎ উদ্দেশ্যে আমি বিএনপির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছি, এটি একেবারেই অসত্য ঢালাও মন্তব্য।
তিনি বলেন, বিগত ১২ ডিসেম্বর প্রেসক্লাব অডিটোরিয়ামে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক বিমান বাহিনী প্রধানসহ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের এক সভায় আমি শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দেবার জন্য দাবি জানিয়েছি।
এ সময় তার দেওয়া বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে আমার দেয়া নিম্নলিখিত ৪টি বক্তব্য বিভিন্ন সংবাদপত্রের পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে :
(ক) জনগণ মনে করে, যে নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা উচিত ছিল সেটি বর্জন করেছে এবং যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিরর্থক সেটিতে অংশ নিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারকে বৈধ্যতা দিয়েছে।
(খ) ২০১৮ সালের মিডনাইট ভোট ডাকাতির নির্বাচনের পর মাত্র পাচঁটি আসনে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় এমপিদের সংসদের অধিবেশনে যোগ দেওয়া উচিত হয়নি।
(গ) দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দু’বছর ধরে কারাগারে অন্তঃরীণ, অথচ আমরা বিএনপি নেতারা, ছাত্রদল, যুবদল তার মুক্তির জন্য কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারিনি।
(ঘ) বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এ দুটি প্রধান দলে গণতন্ত্রের চর্চা নেই।
তিনি দাবি করেন, এসব বক্তব্যে দলীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সম্পর্কে কোনো মিথ্যা কিংবা অসৌজন্যমূলক মন্তব্য করিনি বরং আত্মসমালোচনা করেছি।
ইত্তেফাকে বক্তব্য বিক্রিত করে ছাপা হয়েছে: হাফিজ বলেন, ‘প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় আমি দলীয় স্বার্থ ও শৃঙ্খলাবিরোধী কোনো বক্তব্য দিইনি। সব প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন, এখানে আমাদের বক্তব্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রায়ই বিকৃত এবং খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হয়। আমি ৩৪ বছর যাবৎ রাজনীতি করছি, কখনও কারো বিরুদ্ধে এমনকি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য রাখিনি। অনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধেও অনেক বক্তব্য রেখেছি, কিন্তু কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করিনি। সরকার ঘনিষ্ঠ আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মালিকানাধীন ইত্তেফাক পত্রিকায় শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীর উত্তম এবং আমার বরাত দিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কিত একটি বিতর্কিত বক্তব্য প্রকাশ করা হয়’।
তিনি বলেন, বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মেজর হাফিজের বক্তব্যে নেগেটিভ কিছু নেই। ওই পত্রিকার কাটিংটি আবারো পড়ে দেখার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি কখনোই বেগম খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমান সম্পর্কে অসৌজন্যমূলক বক্তব্য রাখিনি। এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ এনে আমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে বলে মনে করি।
হাজি আরো বলেন, ‘১৩ বছর আগের জরুরি অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমি একজন নগন্য রাজনৈতিক কর্মী, নিজেকে মহাসচিব ঘোষণা করেছি এটি একটি হাস্যকর বক্তব্য। প্রকৃত ঘটনা সবাই জানে। ২৯ অক্টোবর ক্ষমতার করিডোরে অবস্থানকারী সেনা কর্মকর্তারা স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যকে জোরপূর্বক সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের বাসায় নিয়ে যায়। গভীর রাতে সেখানে অনুষ্ঠিত সভায় সাইফুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও আমাকে অস্থায়ী মহাসচিব রূপে ঘোষণা করা হয়। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না, পর দিন বিষয়টি আমাকে জানানো হয়’।
হাফিজ উদ্দিন আরো বলেন, সেনা সদস্যরা কয়েক দিন পরেই আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে জেলে ঢোকায় এবং সাইফুর রহমান গোপনে দেশত্যাগ করেন। ওই সময় রাজনৈতিক অঙ্গণে অনেক ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে, নেতাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার নির্যাতন করা হয়। কারো কারো কাছ থেকে ভবিষ্যতে রাজনীতি করব না এই মর্মে মুচলেকাও আদায় করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের সেনা সদস্যরা সম্মান করে। আমি এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান তাদের অনুরোধ করেছিলাম বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় পুনঃস্থাপিত করার জন্য। কিন্তু তারা আমাদের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়। বিএনপিকে দ্বিখণ্ডিত করার চেষ্টা আমি কখনো করিনি বরং দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেছি। আমার অনুরোধে বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তারা বিএনপির ১০৫ জন এমপিকে ফেরদৌস কোরাইশীর নেতৃত্বাধীন কিংস পার্টিতে যোগদান থেকে বিরত রাখেন। তারা আজও বিএনপিতে আছেন’।
‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার আইনজীবি নওশাদ জমিরের মাধ্যমে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য আমার কাছে নির্দেশ পাঠান। সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার তার বাসভবনে আমাকে ও মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে বৈঠকে উপস্থিত হবার জন্য অনুরোধ করেন। আমি তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত হই, কিন্তু দেলোয়ার সাহেব আসেননি। পরদিন আমি খোন্দকার দেলোয়ার সাহেবের সাথে বারডেম হাসপাতালে একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হই, রুহুল কবির রিজভী আমাকে সেখানে প্রবেশ করতে দেখেছেন। পরবর্তী সপ্তাহে এমপি হোস্টেলে বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহানের বাসায় খোন্দকার দেলোয়ারের সাথে দেড় ঘন্টাব্যাপী এক বৈঠকের পর আমাদের ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়। মহাসচিব আমাকে সেনা কর্তৃপক্ষের সাথে দেন দরবার করে বিএনপিকে ক্ষমতায় নেবার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলেন। পরবর্তীকালে আমি বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া ও খোন্দকার দেলোয়ারের নেতৃত্বে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ রয়েছে বলে বক্তব্য রাখি’।
হাফিজ লিখিত বক্তব্যে আরো বলেন, ‘বেগম জিয়া কারামুক্ত হবার পর আমি তার সাথে দেখা করি। জেলখানা থেকে পাঠানো তার সকল নির্দেশ পালন করেছি জানালে তিনি আমার প্রতি সদয় আচরণ করেন। আমার কার্যক্রম পর্যালোচনা করেই তিনি আমাকে ২০০৮, ২০১০ এর উপনির্বাচন, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছেন। আমি এজন্য কৃতজ্ঞ। আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার দলীয় সংস্কার প্রস্তাবকে বিএনপির ১০৫ জন এমপি সমর্থন দিয়েছেন। এদের মধ্যে মাত্র ৫ জনকে ২০০৮ এর সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে’।
‘আমি কখনই আমার নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির কোনো কর্মীকে নাজেহাল করিনি, দলীয় কার্যক্রমেও নিষ্ক্রিয় করে রাখিনি। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর কতিপয় বিএনপি কর্মী আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যের সঙ্গে আঁতাত করে বিএনপি কর্মীদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে। বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটি লালমোহন ও তজুমুদ্দিন থানায় দু’জন নেতাকে দলীয় শঙ্খলা ভঙ্গের জন্য বহিষ্কার করে। এদের একজন রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষর জাল করে চিঠি ইস্যু করার কারণে বহিষ্কৃত হয়। এরা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিল, বিএনপি ক্ষমতাসীন হবার পর আমাদের দলে যোগ দিয়েছিলেন, দল ক্ষমতাচ্যুত হবার পর আওয়ামী লীগে ফিরে যায়’।
‘আমার নির্বাচনী এলাকায় আমি কোনো গ্রুপিং সৃষ্টি করিনি, গোপন গ্রুপিং থাকলেও সকল নেতা-কর্মী আমার প্রতি অনুগত রয়েছে। দলের মূল কমিটি এবং অঙ্গসংগঠনের কমিটিসমূহ গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে কাউন্সিলরদের ভোটে গঠন করা হয়েছে। ভোলা জেলা বিএনপি কমিটিও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে। আমার এলাকার আওয়ামী এমপি একজন বড় মাপের সন্ত্রাসী, নিজেই গুলি করে একজন যুবলীগ কর্মী হত্যায় অভিযুক্ত। তার অত্যাচারে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের প্রধান নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়া। অনেকেই আওয়ামী ক্যাডারদের আক্রমণে আহত হয়েছে। আমি এদের সকলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি এবং আইনজীবি নিয়োগ করে অব্যাহতভাবে আইনি সহায়তা প্রদান করে আসছি’।
‘কর্মীর মূল্যায়ন না করলে আমি কীভাবে পর পর ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি? পাকিস্তানী আমলে এ আসন থেকে আমার পিতা ডা. আজহার উদ্দিন আহমদও বিরোধী দলের প্রার্থী রূপে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমরা নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার করার জন্য নয়, জনগণের কল্যাণ সাধনের জন্য রাজনীতি করি। একটি উপজেলাকে নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করেছি এবং এলাকায় শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছি বিএনপি শাসনামলে। গ্রামীণ বাজার লালমোহনকে ১ম শ্রেণির পৌরসভায় রূপান্তরিত করেছি। আমি সরকারি সাহায্য ব্যতিরেকে পাঁচটি কলেজ স্থাপন করেছি, যার চারটি আমার পিতা মাতার নামে ও ১টি আমার উপজেলার নামে। আমি অনুরোধ জানাচ্ছি আমার নির্বাচনী এলাকায় কোনো নেতাকর্মী যদি আমার নামে অভিযোগ করে, তাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। বিগত ১২ বছরে এদের নামে কোনো রাজনৈতিক মামলা হয়েছে কি না পরীক্ষা করে দেখা হোক। কেন্দ্র থেকে পাঠানো একটি টিম এলাকায় গিয়ে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করলেই সত্য প্রকাশিত হবে’।