কাগজে-কলমে স্নাতক শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুনে। শেষ হয়েছে আইডি কার্ডের মেয়াদ। কিন্তু বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। স্নাতক সম্পন্ন করতে চার বছর মেয়াদ শেষ হয়ে ছাত্রত্ব শেষ হলেও এখনো তৃতীয় বর্ষের গণ্ডিই পেরোতে পারেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থীরা। অথচ একই সেশনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সেশনজট আর এক বছরের বেশি সময় পিছিয়ে যাওয়াসহ কর্র্তৃপক্ষের অবহেলাপূর্ণ আচরণে হতাশ ও ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা। এছাড়া ডিগ্রি ২০১২-১৩ সেশনের বিশেষ পরীক্ষা না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নয় বছরেও পেরোতে পারেননি তিন বছরের কোর্স।
ঢাকা কলেজের স্নাতক ২০১৬-১৭ সেশনের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিকের গ-ি পেরিয়েই ভর্তি হই ঢাকা কলেজে। ঢাকা কলেজ তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। ভর্তির কিছুদিন পর জানতে পারি ঢাকা কলেজসহ রাজধানীর মোট সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে এমন উদ্যোগে প্রথমে বেশ আনন্দিত হলেও তা বিষাদে রূপ নিতে বেশিদিন লাগেনি। দেরিতে পরীক্ষা নেওয়া, ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা, সেশন জটসহ অন্যান্য সব সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পড়াশোনা এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।’
ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের আরেক শিক্ষার্থী সুমন আল-মামুন। তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে ভর্তি হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থীদের চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা ২৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষার জন্য অপেক্ষমাণ। এরপরই চাকরির বাজারে প্রবেশ করবেন। অথচ আমাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডেন মহিলা কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল অনার্স শেষ করে চাকরি নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াব। দীর্ঘ সেশনজটে এখন অনার্স শেষ করাই দায় হয়ে পড়েছে। এতদিনেও অনার্স শেষ না হওয়ার বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। মানসিকভাবেও বেশ চিন্তিত আছি।’
শুধু ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থীরাই নয় বরং ঢাবির অধিভুক্ত সাত কলেজের ২০১৫-১৬ সেশন এবং ডিগ্রি ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থীরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। যথাসময়ে পরীক্ষা না হওয়ার দরুন অনার্স সম্পন্ন হওয়ার চূড়ান্ত সময় পেরোলেও ১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থীরা এখনো বসতে পারেননি চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায়। এছাড়া ডিগ্রি ২০১২-১৩ সেশনের বিশেষ পরীক্ষা না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নয় বছরেও পেরোতে পারেননি তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স। ইডেন মহিলা কলেজের ডিগ্রি ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী মারিয়া বলেন, ‘২০১২ সালে আমি তিন বছরমেয়াদি ডিগ্রিতে ভর্তি হই। আজ অবধি আমার তিন বছরমেয়াদি ডিগ্রিই শেষ হয়নি। অথচ আমার মেয়ে এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে আর আমি মেয়ের মা এখনো ডিগ্রিতে পড়ি।’
সরকারি তিতুমীর কলেজে ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ টিটু বলেন, ‘এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে পৌঁছেনি শিক্ষার্থীদের আবেদন। কিন্তু কেউ তা কর্ণপাত করেননি। সেশনজট এবং নানারকম অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার বলি হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।’
এ বিষয়ে কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এবং সাত কলেজের সমন্বয়ক অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার বলেন, ‘শিগগিরই যেন এসব সমস্যা সমাধান করা যায় তার জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ চলছে।’