বাদীর বিরুদ্ধেই মামলার নির্দেশ হাইকোর্টের

দুই বছর আগে মেয়েকে হত্যার অভিযোগে জামাতা মো. কাউসার গাজীর বিরুদ্ধে বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছিলেন শ্বশুর আবদুল জলিল দুয়ারি। কিন্তু মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন উল্লেখ করে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে থাকা এ মামলায় জামাতার অব্যাহতির সুপারিশ ও তার জামিনের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন উচ্চ আদালতে।

এমন পরিস্থিতিতে মিথ্যা তথ্যে মামলা করায় বাদী জলিল দুয়ারির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মামলা রুজু করতে পটুয়াখালীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আসামি কাওসার গাজীকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছে আদালত।

মঙ্গলবার বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। হাইকোর্ট এ ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করে।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, মামলাটিতে অভিযোগ গঠন শেষে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। নিজের কন্যা হত্যার ঘটনায় বাদী হয়ে মামলা করে এখন সেটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করার এমন অস্বাভাবিক ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেউ যদি মিথ্যা অভিযোগে মামলা করে বা করায় তাহলে সেই ব্যক্তি দুবছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

এছাড়া কেউ যদি কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা সাত বছর বা এর বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ করে তাহলে অভিযোগকারী ব্যক্তির সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

মামলার এজাহারে বাদী জলিল দুয়ারি উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পটুয়াখালীর বহালগাছিয়া গ্রামের বড় গাজী বাড়িতে তার মেয়ে সাথী আক্তারকে মাথায় আঘাত ও শারীরিক নির্যাতন করে করে স্বামী কাওসার ও পরিবারের অন্যরা। পরে সংজ্ঞাহীন সাথীকে পার্শ্ববর্তী একটি নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলিয়ে রেখে মৃত্যু নিশ্চিত করে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়।

এ ঘটনার দু মাস পর ২০১৯ সালের ১২ মার্চ পটুয়াখালীর থানায় কাউসার, সাথীর শ্বশুর জাফর গাজী (৬০), শাশুড়ি মোসাম্মাত ফাতেমা (৫০) ও কাউসারের বড় ভাই আলামিন গাজীর (৩৫) বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ও ২০১ ধারায় হত্যা ও আলামত গোপনের মামলা করেন জলিল দুয়ারি।

আসামি কাউসারকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। প্রায় ২১ মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন কাওসার। অধস্তন আদালতে জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর হাইকোর্টে তার পক্ষে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা নথি বরাত দিয়ে জানান, এ ঘটনায় সাথীর পাঁচ বছরের মেয়ে পটুয়াখালীর সংশ্লিষ্ট আদালতে জবানবন্দিতে জানায়, তার আব্বু (কাওসার) তার আম্মুকে লাঠি দিয়ে মাথায় এবং দাদা শরীরে আঘাত করে। পরে রশি দিয়ে তাকে ঝুলিয়ে রাখে। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি চিকিৎসকদের দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মাথায় আঘাতের বিষয়টি উঠে আসে। নিহত সাথী আক্তারের এক বছরের একটি ছেলে রয়েছে।

গত বছরের ৩১ আগস্ট এ মামলায় পটুয়াখালীর সংশ্লিষ্ট আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। তাতে সাথীর শ্বশুর, শাশুড়ি ও ভাশুরকে অব্যাহতি দিয়ে একমাত্র আসামি করা হয় স্বামী কাউসারকে। অভিযোগপত্রে সাথীর পাঁচ বছরের শিশুসহ সাক্ষী করা হয় মোট ১৯ জনকে।

আইনজীবীরা জানান, ইতোমধ্যে এ হত্যা মামলাটিতে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট আদালত। কিন্তু দীর্ঘ দিন পর সাথীর বাবা ও মামলার বাদী জলিল দুয়ারি প্রথমে বিচারিক আদালতে এবং চলতি সপ্তাহে হাইকোর্টে অ্যাফিডেভিট (হলফনামা) করে জানান, প্রকৃতপক্ষে তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কিছু কুচক্রী লোকের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে জামাতা কাউসারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন যা আদৌ সত্য নয়। কাওসার গাজীকে মামলা থেকে অব্যাহতি ও জামিনের পক্ষে সাফাই দেন তিনি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমার মেয়ে সাথী আক্তার জামাতাকে ভুল বুঝে রাগান্বিত হয়ে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় মেয়ের জামাই ও তার বাবা-মা জড়িত নয়। আমার মেয়ের জামাই দুটি নাবালক সন্তানের বাবা। ওদের ভবিষ্যৎ দেখাশোনার জন্য মামলাটি পরিচালনা করা আমার আবশ্যকতা নেই।’

মামলাটিতে শুনানিতে আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. আসাদ মিয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ড. বশির উল্লাহ।

ডিএজি বশির উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়েকে হত্যার অভিযোগে বাবা মামলা করলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও মাথায় আঘাতের চিহ্ন, মামলায় চার্জ গঠন হয়ে সাক্ষ্য শুরুর সময় বাদী বলছেন এ মামলায় তার এখন আবশ্যকতা নেই। বাদীর এমন আচরণ অস্বাভাবিক।

তিনি বলেন, একদিকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করা এবং হলফনামা দিয়ে আসামির জামিনের সাফাই দেওয়ায় হাইকোর্ট উষ্মা প্রকাশ করে বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, প্রায়ই মিথ্যা তথ্য দিয়ে আসামিপক্ষ জামিন করানোর চেষ্টা চালান। এ ধরনের ঘটনা রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার বলেই তাই এই আদেশ (বাদীর বিরুদ্ধে মামলা)।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, ‘কারও দ্বারা প্ররোচনার শিকার হয়ে বা অন্য কোনো কারণে বাদী এটি করেছেন কি না তা পুলিশের তদন্তেই আশা করি বেরিয়ে আসবে।’

আসামি কাউসারের আইনজীবী মো. আসাদ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার দুই মাস পর মামলা করেছেন বাদী, আসামির দুটি নাবালক সন্তান রয়েছে, সুরতহাল রিপোর্টে মৃতের শরীরে কোনো আঘাতের উল্লেখ না থাকলেও ময়নাতদন্তে মাথায়  আঘাত রয়েছে, এক বছর ধরে কোনো সাক্ষী আসছে না- এসব গ্রাউন্ডে (যুক্তি) আমরা জামিনের আবেদন করেছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘বাদী জামিনের আবেদন না করলেও তিনি হলফনামায় আসামির অব্যাহতি পেলে আপত্তি থাকবে না বলে জানান। তার এই হলফনামাটি আমরা জামিনের আবেদনে উল্লেখ করেছিলাম। আদালত জামিন মঞ্জুর করে বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মামলা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।’