পাকিস্তানে রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা বেলুচিস্তানি রাজনৈতিক কর্মী কারিমা বালুচ নিরাপত্তার কারণে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।
কানাডায় নির্বাসিত জীবনযাপনকারী এ নারী অধিকারকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়।
টরোন্টোয় রোববার থেকে নিখোঁজ ছিলেন কারিমা। পরে পুলিশ তার মৃতদেহ উদ্ধার করে।
কারিমার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তানে জন্ম নেওয়া ৩৭ বছর বয়সী কারিমা নিখোঁজ হওয়ার পর টরোন্টো পুলিশ একটি আপিল জারি করে।
পরে তার বন্ধুরা জানিয়েছেন, তার মৃতদেহ পাওয়া গেছে।
২০১৬ সালে বিবিসির ১০০ প্রেরণা দানকারী নারীর তালিকায় একজন হিসেবে নির্বাচিত হন কারিমা। তার আগেই বেলুচিস্তানে প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং পাক সরকারের রোষানলে পড়েন।
এক টুইটে টরোন্টো পুলিশ জানিয়েছে, সর্বশেষ রোববার শহরের কুইন্স কি ওয়েস্ট এলাকার বে স্ট্রিট এলাকায় কারিমাকে দেখা গেছে।
এরপরে আরেকটি টুইটে পুলিশ জানায়, তার অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু এর বেশি বিস্তারিত কিছু ওই টুইটে বলা হয়নি।
কারিমার বন্ধু এবং সতীর্থ অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেলেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
মঙ্গলবার কারিমার বোন মাহগানজ বালুচ বিবিসিকে বলেন, ‘তার বোনের মৃত্যু কেবল পরিবারের জন্যই নয়, বেলুচিস্তানের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্যই এক ট্র্যাজেডি।’
তিনি বলেন, ‘ও (কারিমা) বিদেশে যেতে চায়নি, কিন্তু যেহেতু পাকিস্তানে অধিকার দাবি করার কারণে ওর জন্য দেশে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।’
বেলুচিস্তান প্রদেশে বহু বছর যাবৎ স্বাধিকার আন্দোলন চলছে। সেখানকার অন্তত আধা ডজন দল বা গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে স্বাধীন বেলুচিস্তানের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
কারিমা বালুচ পাকিস্তানের নিষিদ্ধ সংগঠন বালুচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন-বিএসও’র সাবেক সভাপতি ছিলেন। সংগঠনটির প্রথম নারী নেতাও ছিলেন তিনি।
প্রাণ নিয়ে সংশয় বোধ করায় রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে কানাডায় বাস করছিলেন তিনি।
তার এক দশক আগে ২০০৫ সালে বেলুচিস্তানের তুরবাত এলাকায় একজন আন্দোলনকারী হিসেবে তার উত্থান ঘটে।
সেখানকার নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান দাবি করে এক মিছিলে তাকে প্রথম দেখা গিয়েছিল, যেখানে তিনি নিজেও তার একজন নিখোঁজ আত্মীয়ের ছবি নিয়ে পথ হেঁটেছিলেন।
বেলুচিস্তানে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানকার হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী গুমের শিকার হয়েছেন।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে।
কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের দাবির কারণে রাজনৈতিক কর্মীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এমন অভিযোগ কখনোই স্বীকার করেনি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।
কারিমা বালুচের পরিবারের কয়েকজন সদস্য বহু বছর ধরে স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, এবং তার একজন চাচা ও একজন মামা এর আগে নিখোঁজ হন, যাদের মৃতদেহ পরে পাওয়া যায়।
দুই হাজার ছয় সালে তিনি বিএসও’র প্রধান হন। পরের বছর সংগঠনটির বহু কর্মী হয় ‘নিখোঁজ’ অথবা আত্মগোপনে চলে যায়, এবং ২০১৩ সালে সরকার সংগঠনটি নিষিদ্ধ করে।
কারিমা বালুচের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মামলা করা হলে তিনি নির্বাসনে চলে যান।
টরোন্টোতে বসবাস শুরু করার পর সতীর্থ রাজনৈতিক কর্মী হামাল বালুচকে বিয়ে করেন কারিমা।
নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেও তিনি সামাজিক মাধ্যম এবং কানাডা ও ইউরোপে মানবাধিকার কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।
পরের বছর তিনি বিবিসির ১০০ প্রেরণা দানকারী এবং প্রভাবশালী নারীর বার্ষিক তালিকায় স্থান করে নেন।
কারিমা বালুচের মৃত্যুর খবরে বেলুচিস্তান ন্যাশনাল মুভমেন্ট-বিএনএম ৪০ দিনব্যাপী শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে।