ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে জমে ওঠেছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। এর মধ্যে দল-বদলের কারণে এক রাজনীতিবিদ-দম্পতির বহুদিনের সংসার হুমকির মুখে পড়েছে।
বিবিসি জানায়, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির একজন এমপির স্ত্রী দল বদল করে প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিলে স্বামী থেকে প্রকাশ্যে বিচ্ছেদের হুমকি পেয়েছেন।
এ খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর তুমুল আলোচনা হচ্ছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমও এই ইস্যুতে সরগরম।
ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এমপি সৌমিত্র খাঁর স্ত্রী সুজাতা মণ্ডল খাঁ দল পরিবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস পার্টিতে যোগ দেন। এর একদিন পরেই স্ত্রীকে ডিভোর্স নোটিশ পাঠিয়েছেন সৌমিত্র।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আর কয়েক মাস পর সাধারণ নির্বাচন এবং তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এই দুটো দল- বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেই। এর মধ্যে তুমুল উত্তাপ ছড়াচ্ছে দল দুইটি।
সুজাতা গত সোমবার কলকাতায় সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদানের কথা ঘোষণা করেন। তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে তিনি বেশ কিছু কারণের কথাও তুলে ধরেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি তার প্রতি কোনো ধরনের সম্মান প্রদর্শন করেনি।
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল থেকে বেশ কয়েকজন ‘দুর্নীতিবাজ নেতাকে’ দলে নেওয়া হয়েছে এবং দলের প্রতি তাদের এই আনুগত্যের কারণে তাদের পুরস্কৃত করারও অঙ্গীকার করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের বি-টিমে পরিণত হয়েছে বিজেপি। তাহলে আমি কেন এই দলে থাকবো? কেন আমি এ-টিম তৃণমূল কংগ্রেসেই যাবো না?’
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন তার স্বামী সৌমিত্র খাঁ। স্থানীয় সাং বাদিকরা এই ঘটনাকে অত্যন্ত নাটকীয় বলে উল্লেখ করেছেন।
এসময় তিনি কাঁদতে কাঁদতে তার স্ত্রীর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের ‘১০ বছরের সম্পর্কের ইতি’ টানার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
স্ত্রী সুজাতা মণ্ডল খাঁ-র প্রতি তিনি অনুরোধ জানান, তিনি যেন তার নাম থেকে খাঁ নামটি ফেলে দেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তার ‘ঘরে ভাঙন ধরানোর’ অভিযোগ করেন।
সৌমিত্র খাঁ বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস আমার স্ত্রীকে চুরি করেছে। দলটি আমার কাছ থেকে আমার ভালোবাসা ছিনিয়ে নিয়েছে।’
কলকাতার স্থানীয় একজন সাংবাদিক বলেন, ‘এরকম রাজনৈতিক নাটকের ঘটনা এর আগে আমরা কখনও দেখিনি।’
এই দুজন রাজনীতিবিদের সংসারে এরকম টানা-পোড়েনের ঘটনা টেলিভিশনের খবরে প্রচারিত হলে তা নিয়ে লোকজনের মধ্যেও আগ্রহের সৃষ্টি হয়।
সোমবারের ওই সংবাদ সম্মেলনের পর স্বামী স্ত্রী দুজনেই সংবাদমাধ্যমে বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন যাতে তারা রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিবাদেও জড়িয়ে পড়েছেন।
সৌমিত্র খাঁ একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সে ছিল আমার ভালোবাসা। সে খুব ভালো স্ত্রী ছিল। সে ছিল আমার একমাত্র দুর্বলতা। অবশ্যই আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। আমরা ১০ বছর এক সঙ্গে ছিলাম।’
তিনি স্বীকার করেন গত বছরের নির্বাচনে তার জয়ের পেছনে স্ত্রী সুজাতা খাঁয়ের ভূমিকা ছিল।
বিজেপির এই এমপি জানান, ফৌজদারি অপরাধের একটি মামলায় আদালত থেকে তার নির্বাচনী এলাকায় যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। সেসময় স্ত্রী সুজাতা খাঁ তার পক্ষ হয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের কাছে ভোট চেয়েছেন। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে গিয়ে তিনি নির্বাচনী সভা সমাবেশেও ভাষণ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের সেই গল্প শেষ হয়ে গেছে। তার সঙ্গে এখন আমার আর কোনো যোগাযোগ নেই। আমি এটা মেনে নিয়েছি যে সুজাতা এখন আর আমার কেউ নয়।’
সুজাতা মণ্ডল খাঁও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে গত ১০ মাস ধরে তিনি তার কোনো যত্ন নিচ্ছেন না।
তিনি বলেন, ‘রাজনীতি নিয়ে তিনি খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমার জন্য তার কোনো সময় নেই। কয়েক মাস ধরে তিনি এটা জানার প্রয়োজনও মনে করেন না যে আমি খেয়েছি বা ঘুমিয়েছি কিনা।’
বিজেপির নেতাদের বিরুদ্ধেও তিনি অভিযোগ করে বলেন যে, তারা তার স্বামীকে উসকানি দিচ্ছে এবং তার ‘বিয়ে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে।’
একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় কাঁদতে কাঁদতে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তার ওপর কাদের চোখ পড়েছে যে সৌমিত্র আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে?’
ভারতে পাল্টা-পাল্টি দল বদলের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সৌমিত্র খাঁয়ের বেলাতেও একাধিকবার এই ঘটনা ঘটেছে।
তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কংগ্রেসে যোগ দানের মধ্য দিয়ে। পরে ২০১৩ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস যোগ দেন ক্ষমতাসীন দল বিজেপিতে।
এছাড়া ভারতে একই পরিবারের সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সমর্থক হওয়াও নতুন কিছু নয়।
সুজাতা খাঁ বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গেও বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ- পিতা ও পুত্র, চাচা ও ভাতিজা এবং ভাইয়েরা প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করছে কিন্তু তারপরেও "তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করছে এবং কেউ তাদের ডিভোর্স দিতে বলছে না।’
তিনি বলেন, ‘এটা বিজেপির ষড়যন্ত্র। তারা তাকে বলছে আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি মনে করি রাজনীতি আর ঘর দুটো আলাদা বিষয় এবং এগুলোকে আলাদা রাখা উচিত।’
কিন্তু সাংবাদিকেরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যখন এতটাই মেরুকরণ ও বিভাজন ঘটেছে তাতে আগামী নির্বাচনের আগে এরকম বলা যতো সহজ করাটা ঠিক ততটাই কঠিন।