নারায়ণগঞ্জে ‘মৃত’ স্কুলছাত্রীর (১৫) ফিরে আসার ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তে পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ডে) থাকাবস্থায় আসামিদের মারধর, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
‘ধর্ষণ ও হত্যার’ শিকার পঞ্চম শ্রেণির ওই ছাত্রীর জীবিত ফিরে আসার ঘটনার সার্বিক বিষয়ে বিচারিক অনুসন্ধান করে নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের দেওয়া প্রতিবেদন মঙ্গলবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে দাখিল করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, রিমান্ডে থাকাবস্থায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও নারায়ণগঞ্জ সদর থানার এসআই মো. শামীম আল মামুন আসামিদের মারধর, প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানে বাধ্য করার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
এছাড়া রিমান্ড মঞ্জুর ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কোনো অনিয়ম বিচারিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়নি। আদালত প্রতিবেদনের ওপর শুনানির জন্য ১৩ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছে।
আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পি।
তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে শিশির বলেন, মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই পুলিশ সদস্য আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেন।
তিনি জানান, ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের ক্ষেত্রে ছয়টি সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশনা চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। সেগুলো হলো– স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধের সময় উভয়পক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতি; জবানবন্দি দেওয়ার পূর্বে আসামিকে তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ; জবানবন্দি লিপিবদ্ধের সময় অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা; একাধিক আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি একসঙ্গে লিপিবদ্ধ না করা; সন্দেহ দূরীকরণে আসামির স্বীকারোক্তি টাইপ না করে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক স্বহস্তে লেখা এবং ম্যাজিস্ট্রেট যেন আইনগত সমস্ত পদ্ধতি অনুসরণ করার জন্য যৌক্তিক সময় পান, সে ব্যাপারে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।
নারায়ণগঞ্জের ওই ঘটনাটি নজরে আনা হলে গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর এক আদেশে সেটির বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। কিশোরীর বাবার করা মামলার নথি, বর্তমান ও আগের দুই তদন্ত কর্মকর্তাকে গত ২৭ আগস্ট এক আদেশে ১৭ সেপ্টেম্বর হাজির হতে তলব করেছিল হাইকোর্ট। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই কর্মকর্তা হাইকোর্টে হাজির হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা ও নথিপত্র দাখিল করেন। নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় করা কিশোরীর বাবার মামলা এবং মামলা-পরবর্তী প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা, বৈধতা এবং যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গত ২৫ আগস্ট হাইকোর্টে পাঁচ আইনজীবীর পক্ষে রিভিশন মামলাটি করেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া ওই ছাত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর ৬ আগস্ট তার বাবা নারায়ণগঞ্জ থানায় অপহরণ মামলা করেন। এরপর পুলিশ আবদুল্লাহ (২২), রকিব (১৯) ও খলিল (৩৬) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। দুই দফা রিমান্ডের পর নারায়ণগঞ্জের বিচারিক হাকিমের আদালতে তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
জবানবন্দিতে তারা জানান, কিশোরীকে দল বেঁধে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২৩ আগস্ট জানা যায়, কিশোরীকে খুঁজে পাওয়া গেছে এবং পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। সে ইকবাল নামে একজনকে বিয়েও করেছে।