হারিয়ে যেতে বসেছে মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড়

খেজুর রস’ খেজুর গুড়’ দক্ষিণের দ্বার মাদারীপুর’। খেজুরের রস ও গুড়ের কারণে আদিকাল থেকেই মাদারীপুরের সুনাম। তবে বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ, রস ও গুড়।

বাণিজ্যিকভাবে অন্য অঞ্চলে রপ্তানি না হলেও রাজধানীসহ দেশ-বিদেশে স্বজনদের কাছে পাঠানো হয় এ গুড়। তবে আগের মত গাছ ও রস না থাকায় চড়া দামেই বিক্রি হয় রস ও গুড়।

আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগে বেশি লাভের আশায় চিনি মিশিয়ে গুড় তৈরি করছে।

তবে মাদারীপুরের এই খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য যাতে হারিয়ে না যায় সে জন্যই জেলা প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। 

সকাল হওয়ার আগেই তাপালে রস ঠেলে আগুনের আঁচে ধীরে ধীরে সোনালি, কমলা অবশেষ রক্তিম তার রং। তখন তার কয়েকটি নামে গুড় তৈরি করা হয়।

যেমন ঝোলা গুড়, পাটালি গুড়, খানডা গুড়, নলের গুড়। খুব সকালে গাছ থেকে রস নামিয়ে সেই রস জ্বালিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু গুড়। বাজারে দেখা যায় গুড়ের ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। তবে খাঁটি গুড় পাবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে বেশির ভাগ ক্রেতারা। শীতকাল এলেই মাদারীপুরের খেজুর রস ও গুড়ের ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়।

তবে আগের মত খেজুর গাছ না থাকায় অনেকেই খেজুর গাছের চাষ ও রস সংগ্রহ বাদ দিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া এই গাছ বিলুপ্তির কারণ হিসাবে বলা হয় বিভিন্ন ইট ভাটা জ্বালানি হিসাবে এর ব্যবহার এবং মেহগনি ও রেন্ডি গাছের জন্য গাছে রস না হয়ে অল্পদিনেই মরে যায়।

মস্তফাপুরের গুড় ব্যবসায়ী আজিজুল জানান, আমাদের কাছে চাষিরা যেভাবে গুড় তৈরি করে নিয়ে আসে সেভাবেই বিক্রি করি। তবে আমরা চাই একটু ভালো গুড় বিক্রি করতে। অনেক সময় ক্রেতারা কম দামে গুড় চায় তাই ক্রেতার চাহিদা মেটানো জন্য গুড়ে ভেজাল মিশানো হয় না। তবে কিছু গুড়ে চিনি মিশানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাদারীপুরের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান জানান, গাছ ও জ্বালানির অভাবে এই খেজুর গুড় বিলুপ্তির পথে। এর জন্য সরকারিভাবে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।’

গাছি/শেয়ালী সাদু মোল্লা জানান, আগের মত এখন আর গাছ নাই, মেহগনি ও রেন্ডি গাছের জন্য খেজুর গাছ মরে যায় এবং রস তেমন পড়ে না। আগে ২শ গাছ কাটতাম এখন ৬৫টি গাছ কাটি তা থেকে যতটুকু রস তা দিয়েই গুড় তৈরি করে থাকি।

গাছি/ শেয়ালী জাফর হাওলাদার জানান, আমি নিজে গাছ কাটি এবং নিজেই রসের গুড় তৈরি করে মস্তফাপুর বাসস্ট্যান্ড সড়কের পাশে বসে বিক্রি করি’। আমি গুড়ে কোনো ভেজাল দিই না।’ রস এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। তবে যারা ৪শত থেকে ৫শত টাকার মধ্যে গুড় কিনে নেয় তাদের গুড়ে আমরা কোনো চিনি মিশাই না। আমাদের মাদারীপুরের গুড় অন্য জেলার গুড়ের চেয়ে অনেক ভালো।’

মাদারীপুর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ইয়াকুব খান শিশির বলেন, মাদারীপুরের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নতুন খেজুর গাছ রোপণ ও এখনো যে গাছগুলো আছে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য ব্যক্তিগত ও সরকারি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আমরা চাই আমাদের এ ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন জানান, খেজুর গুড়ের মান ভালো করার জন্য আমরা গুড় প্রস্তুতকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আর খেজুর গাছের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য হর্টিকালচার সেন্টারকে ১০ হাজার চারা গাছের অর্ডার দিয়েছি। আমরা মাদারীপুরের খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করব।

সাবেক নৌ পরিবহন মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খান এমপি বলেন, মাদারীপুরের ঐতিহ্য খেজুর রস ও গুড়। যাতে আমাদের এ ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারি তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আর বিশেষ একটি প্রকল্পের জন্য আমি কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবো।