প্রচারণায় উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

নির্দেশনা থাকলেও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। করোনা সংক্রমণ রোধে বড় জমায়েত না করতে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হলেও বিপুল কর্মী আর গাড়ির বহর নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ও কাউন্সিলররা। বিশেষ করে পাড়া-মহল্লায় কাউন্সিলর প্রার্থীরা ঘরোয়া বৈঠকে বেশি অমান্য করছেন স্বাস্থ্যবিধি। কোলাকুলি, করমর্দন করেই নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এসব প্রার্থী। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে নির্বাচন পেছানোর পর এখন যদি স্বাস্থ্যবিধিই মানা না হয় তাহলে ওই সিদ্ধান্ত লোক দেখানো বলে বিবেচিত হবে।

এদিকে নির্বাচনী আচরণবিধিতে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে কোনো ধরনের নির্দেশনা না থাকায় কঠোর হতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। আর চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগও তাই কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আগামী ২৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে। গত বছর ২৯ মার্চ এই ভোট হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় করোনা সংক্রমণের হার বাড়ার শঙ্কায় শেষ সময়ে ভোট স্থগিত করা হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় দফায় প্রচারণা শুরু হয়েছে গত ৮ জানুয়ারি। মাঝের এই দীর্ঘ বিরতিতেও নির্বাচন কমিশন স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে নির্বাচনী আচরণবিধিতে দৃশ্যমান কোনো নীতিমালা সংযোজন করতে না পারায় ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটা, ফিরিঙ্গীবাজার, ২ নম্বর গেট, জামাল খান, চকবাজার ও দেওয়ানবাজারসহ প্রায় ১০টি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল ও মিছিল নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। সামাজিক দূরত্ব তো দূরের কথা, এসব কর্মসূচিতে বেশিরভাগই পরছে না মাস্ক। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে চলছে মিছিল ও প্রচারণা। এলাকায় এলাকায় চলছে লিফলেট বিতরণ ও প্রার্থী পরিচিতি ফিরিস্তি তুলে ধরতে বাসায় বাসায় গিয়ে প্রচার।

দেওয়ানবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. তৈয়ব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রচারণার জন্য বেশিরভাগ নেতাকর্মী বাসায় চলে আসছে। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। মাস্ক তো পরছে না, ২০-২৫ জন একসঙ্গে বাসায় বাসায় প্রচারে আসছে। এছাড়া মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহার হচ্ছে না নির্বাচনী কার্যালয়গুলোতে।’

পাথরঘাটার বাসিন্দা বিনয় জলদাস বলেন, ‘আমাদের বাসায় প্রতিদিন প্রার্থীরা আসছে, ছবি তোলার জন্য কোলাকুলি করতে বাধ্য করে। কিছু বললেই উল্টো হুমকি দেওয়ার সুরে কথা বলে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে নির্বাচন পেছানো হয়েছিল। এখন যদি স্বাস্থ্যবিধির জন্য অধ্যাদেশ কিংবা আইন জারিই না হয়, তাহলে নির্বাচন পিছিয়ে লাভ কি হলো! লকডাউনের পরবর্তী সময়েও রোগী বেড়েছে। এখন যেভাবে মানুষ বের হচ্ছে প্রচারণায়, তাতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। নির্বাচনী আচরণবিধিতে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।’

জনস্বাস্থ্য রক্ষা অধিকার কমিটির সদস্য সচিব ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, ‘করোনা কমে যায়নি, প্রতিদিন শনাক্ত হচ্ছে। করোনা রোগী বৃদ্ধি পেলে ক্ষতি তো সবারই। এছাড়া এ মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ থাকে। কিন্তু নিবার্চনকালীন প্রচারণায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত থাকছে। মাস্ক ছাড়াই প্রচারে অংশ নিচ্ছে মানুষ। বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও স্বাস্থ্য বিভাগ প্রার্থীদের নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে সবার জন্য মঙ্গল।’

করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে প্রার্থীরা ডিজিটাল প্রচারণার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে মত দিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে প্রার্থী, নেতাকর্মী ও ভোটাররা।’

নির্বাচনী প্রচারণায় স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আমরা প্রার্থীদের বড়জোর অনুরোধ করতে পারব। অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কিছু আচরণবিধিতে নেই। কমিশনের পক্ষ থেকে সচেতনতার জন্য সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বিভিন্ন স্পটে লিফলেট বিতরণ করেছি। প্রার্থীদের বলেছি, সামাজিক দূরত্ব ও মাস্ক পরিধান করে প্রচার চালাতে। তাদের নাম্বারে মেসেজ পাঠানো হচ্ছে। টেলিফোনেও প্রার্থীদের জানাচ্ছি, তারা যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রচার চালান।’