ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শনিবার। ভোটারদের মধ্যে আলোচনা চলছে নবীন-প্রবীণের ভোট যুদ্ধে কে হচ্ছেন পৌর পিতা? ইতিমধ্যেই নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।
দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রার্থী হয়েছেন পৌর আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা লিপন (নৌকা)। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা কৃষক লীগের (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক মো. লিটন মৃধা (জগ)। ২০০১ ও ২০১০ পৌর নির্বাচনে বিজয়ী সাবেক মেয়র আব্দুস শুকুর শেখ (ধানের শীষ) এবারও বিএনপির প্রার্থী।
এই তিন মেয়র প্রার্থী নিজ নিজ অবস্থান থেকে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া ৯টি ওয়ার্ডে ৩৪জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১১জন প্রার্থী রয়েছে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচন প্রচারণার শেষ দিন বৃহস্পতিবার রাতে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে চায়ের দোকানে ছিল অনেক মানুষের ভিড়। সেখানে আড্ডা দিচ্ছিলেন অটো ভ্যান চালক রাজিব, দলিল লেখক স্বপন সাহাসহ আরও কিছু লোক। চলছিল নির্বাচনী আলাপচারিতা।
এক একজনের মতামত একেক রকম। বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী সেলিম রেজা লিপন মিয়া একজন ক্লিন ইমেজের লোক। তার পরিবারও রাজনৈতিক পরিবার। সাবেক মেয়র বিএনপির শুকুর শেখও আছেন নির্বাচনী প্রচারণায়। আবার মো. লিটন মৃধা স্বতন্ত্র প্রার্থী জগ মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তবে বেশির ভাগ আলোচনায় নৌকা মার্কার সেলিম রেজা এগিয়ে রয়েছেন বলে বিভিন্ন মহলের ধারণা।
আবার কেউ বলছেন লড়াই হবে ত্রিমুখী। তবে এ নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হবে বলে সুশীল সমাজের ধারণা। তারা বলেন, বোয়ালমারীর মানুষ অত্যন্ত শান্তি প্রিয়। ভোট নিয়ে কখনই জোর জবরদস্তি বা কোন হাঙ্গামা হয়নি।
সবারই প্রশ্ন কে হবেন প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভার তৃতীয় মেয়র। নবীন-প্রবীণের লড়াইয়ে কে হবেন পৌর পিতা? তবে এ পৌরসভায় এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়ে কেউ জয়ী হতে পারেননি। দুইবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী আ. শুকুর শেখ। কিন্তু সে সময় কোনো দলের প্রতীক ছিল না। আরেকবার ২০১৬ সালের পৌর নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান মেয়র মোজাফফর হোসেন বাবলু মিয়া। বাবলু মিয়া এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিম রেজার আপন চাচাতো ভাই। বাবলু মিয়া এবার সেলিম রেজা পক্ষে কাজ করছেন।
এর আগে দলীয় প্রতীক নিয়ে যারাই নির্বাচন করেছেন সে সময় আওয়ামী লীগের মধ্যে দুই গ্রুপ ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সব গ্রুপ এক হয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিম রেজা লিপন মিয়ার পক্ষে রয়েছে। ভোট চেয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও ফরিদপুর-১ আসনের সাবেক এমপি আব্দুর রহমান, কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহামুদা বেগম, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. দিলীপ রায়, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপ-গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ক সম্পাদক তানভির আকতার শিপারসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার গত ৮ জানুয়ারি হতে নির্বাচনী মাঠেই রয়েছেন। এছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান এম এম মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মীরদাহ পিকুলসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত প্রচার প্রচারণায় জমজমাট ছিল পৌরসভার প্রতিটি এলাকা। মেয়র, কাউন্সিলরদের ভোট চেয়ে চারদিকে চলছিল মাইকিং, মিছিল, পথসভা, ভোট প্রার্থনা। ওই দিন রাত ১২টায় শেষ হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। এখন চলছে নীরবে ঘরে ঘরে ভোট ভিক্ষা।
এরই মধ্যে কথা হয় বাজারের ব্যবসায়ী শ্যামল সাহার সাথে। তিনি জানান, সাধারণ ভোটাররা এখনো মুখ খুলছেন না। তবে এখন পর্যন্ত আলোচনায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিম রেজা আর বিএনপির শুকুর শেখের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিএনপির প্রার্থী শুকুর শেখ এবার নীরবে চলছেন। প্রচারণায় পিছিয়ে নেই জগ মার্কার প্রার্থী লিটন মৃধাও।
কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, গত তিন বারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভেদ ছিল। কিন্তু এবার সবাই এক হয়ে নৌকার পক্ষে কাজ করছেন। সেজনই মনে হচ্ছে নৌকা প্রার্থী জয়ী হবে। নির্বাচনের এখন যে অবস্থা থাকুক না কেন। নির্বাচনের আগের রাতে অবস্থা পাল্টে যাবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ আওয়ামী লীগের ভোটাররা নৌকার দিকে আর বিএনপির ভোটাররা চলে যাবে ধানের শীর্ষের দিকে।
তিনি বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী লিটন মৃধা এর আগে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছেন। যে যেখানে যা করুক না কেন, যাদের শরীরে নৌকা মার্কার সামান্য গন্ধ আছে তারা নৌকার বাইরে ভোট দেবে না। পৌরসভা ও এলাকার উন্নয়নের জন্য নৌকা মার্কার বিকল্প নেই।
সারা দেশের ৬১টি পৌরসভার সাথে ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসভার ভোট গ্রহণ শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভোটগ্রহণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ভোট গ্রহণের জন্য নয়টি কেন্দ্রে শুক্রবার দুপুরে ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সকল নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভিডিপি, আনসার, পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দুই প্লাটুন বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) মাঠে নেমেছে।
রিটার্নিং অফিসার সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার মো. হাবিবুর রহমান, ইউএনও ঝোটন চন্দ, সহকারী রিটার্নিং অফিসার উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আজমল হোসেন দুপুর ১২টা থেকে প্রিসাইডিং অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিকট নির্বাচনী সামগ্রী হস্তান্তর করেন।
সহকারী রিটার্নিং অফিসার নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আজমল হোসেন বলেন, এখানকার নির্বাচনের পরিবেশ অনেক সুন্দর রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন হওয়ার মতো কোনো ঘটনা এখন পর্যন্ত ঘটেনি। যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঝোটন চন্দ বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, নয়টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ১১.৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের প্রথম শ্রেণির বোয়ালমারী পৌরসভার বর্তমান ভোটার সংখ্যা ২২ হাজার ২৯৭। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার দশ হাজার ৮৮৩ এবং মহিলা ভোটার ১১ হাজার ৩৯৬। এ পৌরসভার শিক্ষার হার প্রায় ৭০ ভাগ। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের জন্য ৯টি কেন্দ্রে ৬২টি ভোট কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে।