বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে যে চার স্তরের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কথা বলা আছে, পৌরসভাগুলোর অবস্থান তাতে গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্তিক শহুরে জনপদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্নে পৌরসভাগুলোর কর্মকাণ্ডই সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত। পৌরসভার প্রথম ধাপের নির্বাচন গত ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রথম ধাপে ২৪টি পৌরসভার নির্বাচন হওয়ার পর আজ দ্বিতীয় ধাপে ৬১টি পৌরসভার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কিন্তু এই দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে ধরনের সহিংসতার খবর মিলেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক।
গত বুধবার রাতে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক কাউন্সিলর প্রার্থীর ভাই খুনের পাঁচ ঘণ্টা পর নদীতে পোঁতা অবস্থায় প্রতিপক্ষ প্রার্থীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহতও হয়েছেন। একই দিন রাতে নরসিংদীর মনোহরদীতে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিন কাউন্সিলর প্রার্থী, সাংবাদিক ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। এ সময় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের তারাবো ও গাজীপুরের শ্রীপুরে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। জানা যায়, আওয়ামী লীগ মনোনীত আর বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যেই এ ধরনের সহিংসতা বেশি ঘটছে। এমতাবস্থায় নির্বাচনী পরিবেশ সংঘাতময় হয়ে ওঠায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে।
প্রধানত স্থানীয় পর্যায়ের ইস্যু নিয়ে এ সহিংসতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর বড় কারণ একই পদে একই দলের একাধিক প্রার্থীর নির্বাচনী মাঠে থাকা। একাধিক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা স্থানীয় পর্যায়ের ইস্যু নিয়ে তারা সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছেন। সরকারি দলের প্রার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ৬১টি পৌরসভার মধ্যে ১৬টিতেই নির্দিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন অতিরিক্ত এসব সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত দেয়। তারপরও ভোটের দিন সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে নানা অনিয়ম এবং জবরদস্তির অভিযোগ পাওয়া গেলেও ভোটারদের তুলনামূলক বেশি উপস্থিতি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করেছে। কিন্তু নির্বাচনী সহিংসতার বাড়-বাড়ন্তের কারণে দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের রীতি সফলভাবে চালু থাকলেও বাংলাদেশে শুরু থেকেই এটি হোঁচট খাচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর থেকে এ পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম কিংবা সহিংসতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মনে রাখতে হবে, স্থানীয় সরকারের এ স্তরে জনগণ সরাসরি স্থানীয় উন্নয়নের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারে। তাই এ স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব অনেক বেশি। তাদের ক্ষমতায়ন জনগণের ক্ষমতায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ পর্যায়ের নির্বাচনে সহিংসতা ঠেকাতে এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ সব ধরনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও দৃঢ়ভাবে কাজে লাগাতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা প্রত্যাশিত। রাজনৈতিক দলগুলোরও বড় দায়িত্ব রয়েছে। তারা নির্বাচনী সন্ত্রাস প্রতিহত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা জানি, নির্বাচনের তিনটি পর্ব থাকে ভোটগ্রহণ-পূর্ব, ভোটগ্রহণ ও ভোটগ্রহণ-পরবর্তী। যেকোনো নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে তিন পর্বেই মাঠ সমতল রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটগ্রহণ পর্বে ভোট কারচুপি বা জালিয়াতি ঠেকাতে প্রতিটি বুথে প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট থাকা আবশ্যক। মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং কার্যকর স্থানীয় সরকারসহ সব পর্যায়ের নির্বাচনের জন্য জনপ্রত্যাশা রয়েছে। একতরফা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন কখনই কাম্য নয়। তাই সবার অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আমেজে দেশ ফিরে আসুক এটাই সবার কাম্য।