সংগ্রামী ইতিহাসের পরম্পরা

মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসে বাঙালির বাংলাদেশ

প্রশ্নটা বারবার আসে, বাংলাদেশের ইতিহাসের বয়স কত? সাধারণত শোনা যায়১৯৪৭ সালের পর পূর্ব পাকিস্তানের বা বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রাম করেছে এবং সেই সংগ্রামের ফলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু এই ধারণাটা কেন আমাদের মধ্যে হয়েছে? এর কারণ এক অর্থে বাংলাদেশের মানুষ এখন যারা আছেন, তারা অন্য কোনো সংগ্রামের ইতিহাস পড়েননি বা তাদের পড়ানোও হয়নি বা সেই সুযোগও তারা পাননি।

আমিও এমন একটা ধারণা নিয়েই বড় হয়েছিলাম যে আমরা পাকিস্তান চেয়েছিলাম; কিন্তু পাকিস্তান পাওয়ার পর আমরা বুঝতে পারলাম যে আমরা এরকম দেশ চাইনি, তাই আমরা এর বিরোধিতা শুরু করলাম এবং তারপর স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু ইতিহাসের দিক থেকে এটা মেলে না। মেলে না এই কারণে যে, কোনো সময়ই একক পাকিস্তানের প্রস্তাব বাংলার রাজনীতিতে ছিল না। সবসময়ই ছিল দুটি আলাদা রাষ্ট্রের প্রস্তাব।

যদিও সেই প্রস্তাবটা নেওয়া হয়েছিল ১৯৪০ সালে, আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল এরও অনেক অনেক দিন আগে থেকে। একটা ঘটনা এই তারিখে শুরু হলো, একটা ঘটনা ওই তারিখে শেষ হলো, ইতিহাসকে এমন আমলাতান্ত্রিক বা কারনিক চোখ দিয়ে না দেখে যদি ইতিহাসকে প্রক্রিয়াগতভাবে দেখি, তাহলে আমাদের চলে যেতে হবে শেকড়েকোন সময় থেকে মানুষ সংগ্রাম করা শুরু করল।

বাংলার বিদ্রোহী কৃষক সমাজ

এদেশের ইতিহাস বহু হাজার বছরের হলেও এখানকার মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসটা কিন্তু আমরা হাজার বছর ধরে পাই না। এখানকার মানুষের সংগ্রাম ইংরেজ শাসনামলে এসে প্রবল আকার ধারণ করল এবং সেই সংগ্রামটা ছিল জঙ্গি সংগ্রাম। এই জঙ্গি সংগ্রামের তিনটা-চারটা পর্যায় আছে। প্রথম পর্যায়ের সংগ্রামের সূচনা ঘটেছিল ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদের কাছে, ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। সেটা ১৭৬০ সাল থেকেই শুরু হয়েছিলএই জঙ্গি সংগ্রামকে সাধারণভাবে আমরা ‘ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ বলি। এবং সেটা ১৭৯৩ (অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত) চলেছিল।

যেটা লক্ষ করা প্রয়োজন তা হলো এই পর্যায়ের সংগ্রামে কিন্তু সবাই ইংরেজের বিরোধিতা করেছিলকৃষক সমাজ তো বটেই, নব্য ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ভূস্বামীরা থাকে নেতৃত্বে। কৃষক সমাজ ছাড়া ভূস্বামীদের আন্দোলন হয় না, আবার কৃষক সমাজের আন্দোলনেও ভূস্বামীদের দেখা যায়। কিন্তু ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর কিন্তু নব্য ভূস্বামীদের ভূমিকা একেবারেই দুর্বল হয়ে যায়। কারণ এই বন্দোবস্তের কারণে তারা লাভবান হচ্ছিল। কিন্তু কৃষকদের যে সংগ্রাম সেটা চলতে থাকল। এ সময় উচ্ছেদ হওয়া ভূস্বামীদের একাংশও এসে কৃষকদের সঙ্গে যুক্ত হলো।

দেখা যাচ্ছে, নতুন-পুরনো ইতিহাসে আন্দোলনের সামনের দিকের মানুষজন পাল্টালেও মূল যে শক্তি সেই কৃষক সমাজ আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্যেই ছিল। এর ধারাবাহিকতায় আমরা অনেকগুলো আন্দোলন দেখেছি। আন্দোলনের বিভিন্ন রূপ দেখেছি। প্রত্যেক সময়ে জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ নিজ নিজ স্বার্থে বা কারণে এসব আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। কিন্তু কৃষক সমাজের আন্দোলনটা সবসময়ই ছিল প্রধানত অর্থনেতিক মুক্তির আন্দোলন।

পত্তনি প্রথা বা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা শুরু হয় ১৮১১ সালে। ১৮১১ সালের পর থেকে আমরা বাংলার জমিদারদের ইংরেজের প্রতি আস্থাশীল গোষ্ঠী হিসেবে দেখিইংরেজের দালাল জনগোষ্ঠী। কিন্তু তারা খুব একটা সক্রিয়ও না সবলও না। এই কারণে কৃষকদের সংগ্রাম তখন আরও বাড়তে লাগল। ইংরেজরা সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছে কৃষক সংগ্রাম কীভাবে কমানো যায়, বন্ধ করা যায়; এজন্য ইংরেজরা কৃষিতে বিভিন্ন রকমের ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টাও করেছে। কারণ তারা দেখতে পাচ্ছিল যে, কৃষক বিদ্রোহটা কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছে না। পশ্চিমাদের বইপত্রেই আছে যে, ইংরেজরা ভেবেছে যে জমিদার শ্রেণিই তাদের প্রতিনিধি; কিন্তু জমিদার শ্রেণিও তখন বিদ্রোহ সামলাতে পারছে না। কারণ কৃষক বিদ্রোহ তখন অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

ইতিহাসের এসব ধারাবাহিকতার আলোচনা করেই আমাদের এগোতে হবে। আমাদের সমস্যা হয়ে গেছে আমরা খালি কোনো একটা তারিখ ধরে আলোচনা করতে চাই, মনে করতে চাই এই দিন থেকেই তাহলে এই ইতিহাস শুরু হলো। ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ হলো তখন জমিদারদের অবস্থা বেশ খারাপ। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সময়কালে যে প্রতিবাদ চলছিল, অর্থাৎ ‘স্বদেশি আন্দোলন’ তার নেতৃত্বে ছিল কলকাতাভিত্তিক বাবু শ্রেণি, এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হয় পূর্ববঙ্গে ও পূর্ববঙ্গ তখন উপ-রাষ্ট্রিক কাঠামো পায়। আরেকটি বিষয় তখন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেটা হলো সর্বভারতীয় রাজনীতি বা দিল্লিকেন্দ্রিক রাজনীতি  প্রবেশ করল বাংলার রাজনীতিতে। আগে সেটা খুব সরবভাবে ছিল না। এরা আসার পর কিন্তু বাংলার রাজনীতির কর্তৃত্ব চলে গেল দিল্লির রাজনীতিকদের হাতে।

১৯১১ থেকে ১৯৩৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত উত্তাল। এই সময়টায় দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক শক্তিগুলো খুব সবল হচ্ছে এবং কৃষক সমাজও সবল হচ্ছে। কৃষকরা বাংলার ইতিহাসে কোনো নরম-শরম গোষ্ঠী না। যে কৃষকরা বিদ্রোহ করছে তারা আসলেই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। সে কোনোদিন ভদ্রলোকের মতো ব্যবহার করেনি এবং করতে চায়ওনি। কারণ এটা তার রুটি-রুজির বিষয় এবং বেঁচে থাকার বিষয়। সে তো সংগ্রাম করবেই। সে কি ভদ্রলোকদের মতো বলবে যে আপনার সঙ্গে নেগোশিয়েট করবসেটা কৃষকরা কখনোই করেনি।

ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব

এমন রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যদি কোনো তারিখ নিয়েই কথা বলতে হয় তাহলে আমরা ওই দিনটি নিয়ে কেন কথা বলি না যেদিন গোপালগঞ্জে ফজলুল হক এবং সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে শেখ মুজিবের দেখা হচ্ছে। আমার মতে এই তিনজনের সাক্ষাৎ নিয়ে আরও আলোচনা করা উচিত। এই কারণে যে, এই ত্রি-শক্তি যখন একত্রিত হচ্ছে তখন রাজনীতির ময়দানে আর কারোর পক্ষেই প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই তিনজনের মোটামুটি একটা সমঝোতার ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে পূর্ববাংলার রাজনীতিটা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কিংবদন্তি কৃষক নেতা ফজলুল হক যখন চলে গেলেন, তখনো কিচ্ছু আসছে যাচ্ছে না, কারণ নেতানির্ভর রাজনীতি তখন দুর্বল হয়ে গেছে।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ফজলুল হকের ভরাডুবি হচ্ছে। কেন হচ্ছে? কারণ কৃষক জানে কোনটাতে তার সুবিধা। যে মানুষ গিয়ে কৃষকবিরোধী হিন্দু মহাসভার সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তার পক্ষে বাংলাদেশের কৃষকের ভোট পাওয়া সম্ভব না। সে বড়লোক কৃষকই হোক বা মধ্যশ্রেণির কৃষক হোক বা গরিব কৃষকই হোক। কারণ মধ্যশ্রেণির কৃষককেও টিকে থাকতে হলে গরিব কৃষকের সম্মতি আদায় করেই থাকতে হবে। কিন্তু ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতার চর্চা আমাদের এখানে খুব একটা হয় না।

১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব হচ্ছে দুই স্বাধীন পাকিস্তানের ভিত্তিতে। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ইস্ট পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি, আবুল হাশিমের লেখাসহ আরও অনেক লেখায়-আলোচনায় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কথা বলা হয়েছে। কোনো জায়গায় বলা হয়নি যে, এটা করাচিকেন্দ্রিক একক-পাকিস্তানের কথা। যদি এটা এক দেশ হতো তাহলে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করত। কেউ একজন প্রতিবাদ করত। কিন্তু কেউ-ই প্রতিবাদ করেনি।

আমাদের ইতিহাস চর্চার দুর্বলতার কারণে আমরা এগুলো উল্লেখ করি না। পাকিস্তানিরাও উল্লেখ করে না। পাকিস্তানিরা যা-ইচ্ছা করুক, সেটা নিয়ে আমাদের আগ্রহ নেই। কিন্তু ভারতীয়দের বিষয়টা কী? বাংলা সম্পর্কে ভারতীয়দের কোনো আগ্রহ নেই, ছিলও না। ভারতীয়রা চেয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে দরকষাকষির মীমাংসা। অর্থাৎ জওয়াহেরলাল নেহরু ও মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর মূল দ্বন্দ্বের অধীনেই বাঙালিদের বিষয়টা দেখতে চেয়েছে ভারতীয় রাজনীতিকরা। বাঙালিদের সংগ্রামকে তারা আলাদাভাবে দেখতে চায়নি। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে আমাদের ইতিহাসবিদরাও এই ধারণা দিয়ে ভীষণভাবে প্রভাবিত।

ভারত-পাকিস্তান নয়, ইতিহাসের তৃতীয় ধারায় বাংলাদেশ

পাকিস্তানের বিরোধী হওয়ার মানেই ভারতীয়দের সমর্থন নয়এখানে যে তৃতীয় একটি বাস্তবতা রয়েছে সেটার প্রধান প্রতিনিধিই হলেন শেখ মুজিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। ইতিহাসের এই তৃতীয় ধারাটিকে আমরা অস্বীকার করে এসেছি। এজন্যই ‘এপার বাংলা-ওপার বাংলা’ আন্দোলনের ধারণা ব্যক্তিগতভাবে আমার অনেক বিরক্তি সৃষ্টি করে। কারণ ‘এপার বাংলা-ওপার বাংলা’ আন্দোলন যদি এতই শক্তিশালী হতো, এর যদি রাজনৈতিক ভিত্তি থাকত, তাহলে ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় কংগ্রেস কেন ভোট দিয়ে পার্টিশন করল? কেন একত্রিত হয়ে বাঙালিদের একটা আলাদা স্বাধীন দেশ চাইল না? অবিভক্ত বাংলা তো স্বাধীন দেশ হওয়ার কথা ছিল। এই ছোট্ট কথাটা কেন আমাদের ইতিহাসবিদরা বলেন না?

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, ১৯৪৭ সালের আগেই শেখ সাহেব বলছেন যেএই দেশটা পাকিস্তানের একটা কলোনি হবে! যদি একই দেশ চাইত সবাই তাহলে তো শেখ সাহেব বলতেন না যে এটা কলোনি হবে। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্টের আগেই যারা পূর্ববাংলা যে কলোনি হতে যাচ্ছে, এটা ভেবে আলাদা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, সেই মানুষদের ধারাবাহিকতাটা কী? এই ধারাবাহিকতা হলেন শেখ মুজিব।

শেখ মুজিব ছাড়া সাতচল্লিশের আগের আর পরের রাজনীতিতে এমন ধারবাহিকতা কেউ বজায় রাখেনি। এখানে আরেকটা বিষয় আছেসোহরাওয়ার্দীকে কেন্দ্র করে যে রাজনীতি। আমি মনে করি সোহরাওয়ার্দী উপনিবেশিক রাজনীতির ধারাবাহিকতার লোক। সোহরাওয়ার্দী, নেহরু, জিন্নাহএরা সবাই বিদেশে লেখাপড়া করা লোক। এমনকি সুভাষ বোসও বিদেশে লেখাপড়া করা মানুষ। শেখ সাহেব বিদেশে লেখাপড়া করা মানুষ না। তিনি এলিট নন।

তিনি যেটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, কৃষকদের তার দরকার, মধ্যস্বত্বভোগীদের তার দরকার এবং ছাত্রদের তার দরকার। যার কারণেই ১৯৪১ থেকে ১৯৪৭-এর মধ্যেই এত দ্রুত কলকাতার রাজনীতি দখল করাটা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। কেন সম্ভব হয়েছিল সেই প্রশ্নটা করা দরকার। এটা শেখ সাহেবের আত্মজীবনীতেই আছে। তিনি বলছেন যে, আমরা বস্তি পাহারা দিতাম। সবাই জানত যে আমরা বন্দুক চালাতে জানি। এই যে সাহসটা বস্তি পাহারা দেওয়া এবং সংকোচহীনভাবে এটা বলতে পারাএটা গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসটাকে বুঝতে চাই তাহলে আমাদের বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র কাছে যেতে হবে। কারণ অনেক কিছু পরিষ্কার হয়েছে এই ইতিহাসগ্রন্থের মধ্য দিয়ে। শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, সামাজিক ইতিহাসও। আমাদের এখানে সামাজিক ইতিহাস কেউ লেখে না। বঙ্গবন্ধু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমাজের অনন্য রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসকারও।

আমাদের এটা ভাবতে হবে যে বাংলার মানুষরা সংগ্রামী হলো কীভাবে যদি তার আগের অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্য ইতিহাস না থাকে, ধারাবাহিকতা না থাকে। এ কারণেই গোপালগঞ্জের গুরুত্ব। গোপালগঞ্জের ঐতিহাসিক গুরুত্ব হচ্ছে সেটা একটা মাইক্রোকোজম যেটার মধ্য দিয়ে গোটা বাংলা বা বাংলাদেশের রাজনীতির চিত্রটা উঠে আসে। প্রতিবাদের রাজনীতি বলতে যা বোঝায়, সেই প্রতিবাদের রাজনীতি থেকে শেখ মুজিবের উত্থান। পূর্ববাংলা এই প্রতিবাদের রাজনীতির বিশাল ক্ষেত্র। ১৭৫৭ থেকে ১৭৯৩-ই শুধু নয়, এর ধারাবাহিকতায় আরও নানা প্রতিবাদী আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে বাংলায়। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে ফরায়েজী আন্দোলনসহ আরও অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম। ধারাবাহিকতা বুঝতে হবে।

যে কারণে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-কে ভাগ করার কোনো প্রয়োজন হয় না। কারণ কে মেনে নিয়েছিল ১৯৪৭? কিছু লোক হয়তো গান-কবিতা লিখেছে পাকিস্তান নিয়ে। কিন্তু ১৯৪৮ সালেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকে শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকেই বোঝা যায় যে, পাকিস্তান ছিল বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটা রাষ্ট্র।

আর পাকিস্তান আসলে কোনো ‘রাষ্ট্র’ই ছিল না। ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে যেটা দিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার বোঝা যায়‘ফলস্ স্টেট’। বাংলায় বলা যায়‘ভুয়া রাষ্ট্র’ বা ‘ভ্রান্ত রাষ্ট্র’। তো বাঙালিরা কেন ‘ভুয়া রাষ্ট্রে’র অংশ হবে? এটা অনৈতিহাসিক রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিয়েছিল বলেই ২৪ বছরও টেকেনি। আমরা এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েবাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ৫০ বছর টিকে আছে, টিকে থাকবে।

এখানে আরেকটা বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখাতে হবে, সেটা হলো একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বাংলাদেশের কৃষক সমাজের ভূমিকা। বাংলাদেশের এলিট সমাজ, এলিট রাজনীতিকরা বলতে চেষ্টা করেনআমরাই সব করেছি। তাহলে মুক্তিযুদ্ধে কৃষকদের ভূমিকাটা কী আসলে? তারা একটা মুক্তিযোদ্ধাকে দেখাক যে একাত্তরে কৃষকদের সাহায্য ছাড়া টিকে ছিল। একাত্তরে কৃষকের ভূমিকা আর নারীর ভূমিকা দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু খুব কম আলোচিত। একটা কৃষিপ্রধান দেশে কৃষকরাই যে মূলশক্তি হবেন এটাই তো খুবই স্বাভাবিক। শেখ মুজিব এটা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই পূর্ববাংলার কৃষক সমাজের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি দেখতে হলে কৃষক সমাজের সংগ্রামের ধারাবাহিকতা দেখতে হবে। আর শেষ পর্যায়ে যখন স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া চলছে সে আন্দোলনের প্রধান মানুষটা হয়ে উঠলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক,কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক

afsan.c@gmail.com