স্বল্পোন্নত দেশের কাতার (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরেও ২৮ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অব্যাহত শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম অবাধ এবং শ্রম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আরও বেশ কিছু বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইইউর রাষ্ট্রদূত রেঞ্জি তেরেগ্ধিক। এসব পদক্ষেপের মধ্যে আছে রানা প্লাজা ধসের পর কর্মপরিবেশ উন্নয়নে অগ্রগতি ধরে রাখা এবং সংশোধিত শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সংলাপে এসব শর্তের কথা বলেন রাষ্ট্রদূত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং জিএসপি প্লাসের সম্ভাবনা বিষয়ক সংলাপটি গতকাল বুধবার অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে সরকারের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি ও শ্রমিক নেতারা অংশ নেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সংলাপ আয়োজনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
এলডিসি থেকে উত্তরণে শেষ প্রক্রিয়ায় রয়েছে বাংলাদেশ। উত্তরণে সব মানদ- পূরণ হয়েছে ইতিমধ্যে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) পর্যালোচনা সভায় ™ি^তীয় বারের মতো উত্তরণের সুপারিশ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। উত্তরণে চূড়ান্ত সুপারিশের পর আরও ৩ বছর শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে। অবশ্য, গত সপ্তাহে সিডিপির সঙ্গে এক বৈঠকে ৩ বছরের অতিরিক্ত আরও ২ বছর এই সুবিধা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর উন্নত দেশে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আর পাওয়া যায় না। ব্যতিক্রম হিসেবে ইইউতে এভরি থিংক বাট আর্মস (ইবিএ) নামের স্কিমে বর্তমান এই শুল্কমুক্ত সুবিধা অতিরিক্ত ৩ বছর অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ ২০২৭ সালের পর আর ইইউর দেশগুলোতে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে না। তবে ‘জিএসপি প্লাস’ নামে নতুন স্কিমের আওতায় এই সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ইইউ রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে বিভিন্ন শর্ত প্রতিপালন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইতিমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্যোগ এবং অগ্রগতির প্রশংসা করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তেরেগ্ধিক বলেন, রানা প্লাজা ধসের মর্মান্তিক ছায়া থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে বাংলাদেশ। জিএসপি প্লাস নিয়ে বাংলাদেশ এবং ইইউর একটি যৌথ কমিশন কাজ করছে। একটি রোডম্যাপ হয়েছে। এতে সহযোগিতা করছেন তারা। এ বিষয়ে ক্রেতাদের দায়িত্বশীল ভূমিকার কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পুটিয়াইনেন বলেন, বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে সংস্কার অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। মান রক্ষা, শ্রম আইন , ইপিজেড এবং এসইজেড শ্রম আইনের বৈষম্য দূর করতে হবে। শ্রম বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সব পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সুশীল সমাজ, আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে কার্যকর সামাজিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যৎমুখী শ্রমনীতি এবং সরকারের এ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা থাকতে হবে। আইএলওর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব সুবিধা অব্যাহত রাখা হবে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জন্য জিএসপি প্লাস যেমন দরকার একই সঙ্গে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া সহজ হবে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শ্রম আদালত বাড়াতে হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় দেশের আইনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিজিএমইএ সহ-সভাপতি আরশাদ জামাল দীপু বলেন, শ্রম আইনের বিষয়ে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। কেবল আন্তর্জাতিক মান বিবেচনা করলে হবে না। একটি সমন্বিত শ্রমনীতি দরকার, যেন ট্রেড ইউনিয়নের কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত না হয়। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে শ্রমিক নেতা চৌধুরী আশিকুল আলম বলেন, বৈশ্বিক চেইনে ব্যবসা করতে হলে বৈশ্বিক মানদন্ড মেনেই করতে হবে। সব দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আইএলও আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ করে। বিকেএমইএর সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রম আইনে সংশোধনে ইইউ প্রস্তাবিত ১২টি প্রস্তাবের ৬টিই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এসব প্রস্তাব বাংলাদেশ থেকে অতি উৎসাহীদের পাঠানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ক্রেতা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের মহাসচিব ফারুক আহমেদ বলেন, জিএসপি প্লাস সুবিধা একটি রাজনৈতিক ইস্যু। কারণ, পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও বলিভিয়া এই সুবিধা পেলে বাংলাদেশের বঞ্চিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর শ্রম পরিস্থিতি বাংলাদেশের তুলনায় উন্নত নয়।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির বড় বাজার ইউরোপ। মোট রপ্তানির ৫৮ শতাংশ যায় ইইউতে। এরমধ্যে ৬৪ শতাংশই পোশাকপণ্য। ইবিএ প্রত্যাহার হলে এই বাজারে গড়ে ৭-৮ শতাংশ হারে শুল্কারোপ হবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ কারণে প্রতি বছর ইইউতে রপ্তানি কমবে ৬ শতাংশের মতো। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়ন ইবিএর ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। জিএসপি প্লাস পেতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং এসবের অগ্রগতি ও দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন ড. গোলাম মোয়াজ্জেম।