‘নদী জীবন্ত সত্তা এবং পানির ধারক। সুতরাং নদী রক্ষার্থে আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে’, একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ৩ দিন-ব্যাপী ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার গতকাল বুধবার (২৭ জানুয়ারি) এসব কথা বলেন।
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, এনজিও কর্মীসহ অনেকেই এই ভার্চুয়াল সম্মেলনে যোগ দেন। প্রথম দিনের প্রধান থিমেটিক সেশন ছিল ওয়াটার কমনস: লেসনস ফ্রম কভিড-১৯।
নদীর অধিকারের কথা বলতে গিয়ে ড. হাওলাদার আরো উল্লেখ করেন ২০১৯ সালে হাইকোর্ট নদীকে একটি জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে। উন্নত নদী ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশসহ সকল দেশেই আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি-বিধান রয়েছে। এতত্সত্ত্বেও অনেক দেশ নদী ও পানি বণ্টন ব্যবস্থাপনায় সে সকল বিধান বাস্তবায়নে যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করছে না। পানি ন্যায্যতা নিশ্চিতকল্পে আঞ্চলিক সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করার জন্য জোরালো আহ্বান জানান তিনি।
‘ওয়াটার ক্লাইমেট অ্যান্ড জাস্টিস ইন দ্য ওয়েক অব কভিড-১৯’ শীর্ষক সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ যেখানে পানি, জলবায়ু, ন্যায্যতা এবং কভিড-১৯ বিষয় প্রাধান্য পায়।
তিনি উল্লেখ করেন মহামারির প্রভাবে বিশ্বব্যাপী পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যকার অসমতাসহ পানি সম্পদ বরাদ্দে গ্লোবাল নর্থ ও গ্লোবাল সাউথের মধ্যকার অসমতাও আলোচনায় উঠে এসেছে। মহামারির সময়ে পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও দুষ্প্রাপ্যতার সমস্যা মোকাবিলার ওপর ড. আহমেদ আলোকপাত করেন। বিশুদ্ধ পানির দুষ্প্রাপ্যতা উন্নয়নশীল দেশের জন্য মহামারি সময়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মেডিকেল বর্জ্য এবং মাস্ক জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে তিনি যুক্ত করেন।
দ্য গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব ওয়াটার মিউজিয়ামস -এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. এরিবার্তো ইউলিসি তার বক্তব্যে এই নেটওয়ার্কের ভূমিকা তুলে ধরেন । তিনি বলেন, ‘পানি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নে পানিকে অন্তর্ভুক্ত করতে মানুষ ও বিভিন্ন সংস্থাকে যুক্ত করার কাজই হচ্ছে দ্য গ্লোবাল নেটওয়ার্কের।’
পানি জাদুঘরের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. এরিবার্তো ইউলিস বলেন, ‘অতীত এবং বর্তমান ওয়াটার নলেজের একটি সংযোগ হতে পারে এই পানি জাদুঘর যার মাধ্যমে সর্বসাধারণকে নতুনত্ব এবং নতুন মূল্যবোধকে উদ্দীপিত করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এই বৈশ্বিক পানি সংকটের যুগে পানি জাদুঘর হতে পারে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যম। বাংলাদেশের মতো দেশে পানি জাদুঘর নদীর অধিকার রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’ কুয়াকাটার কলাপাড়ায় একশনএইড প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি-বেইজড পানি জাদুঘর এর উদ্যোগকে তিনি প্রশংসা করেন।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘আমরা নানা উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নদী-অধিকারের ইস্যুটি আলোচনায় এগিয়ে নিতে কাজ করে চলছি। আমরা বিশ্বের নদী বিষয়ক বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার্থে পটুয়াখালীতে পানি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছি। হালদা নদী রক্ষা আন্দোলনকেও একশনএইড সমর্থন করছে। নদীকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা দিতেও সরকারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি করে যাচ্ছে একশনএইড বাংলাদেশ।’
আহমেদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য সেন্টার ফর হেরিটেজ ম্যানেজমেন্ট-এর এডজাঙ্কট প্রফেসর সারা আহমেদ বলেন, ‘আমাদের সবাইকে জলবায়ু বিবেচনায় পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন করে ভাবতে হবে।’
সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশনে পল্লিগীতি ও লালন সংগীতের স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীন নদী বিষয়ক জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন। তাছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ এর পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এর লেখা বই ‘রাইটস, রিভারস অ্যান্ড দ্য কোয়েস্ট ফর ওয়াটার কমন্স: দা কেইস অব বাংলাদেশ’ এর ভার্চ্যুয়াল উন্মোচনও হয় সম্মেলনেরে এই সেশনে। একশনএইড প্রতিষ্ঠিত পানি জাদুঘরের স্থাপত্যবিদ রাজন দাশ তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন সম্মেলনের ২য় পর্বে।
তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলন চারটি থিমেটিক সেশন- ওয়াটার কমনস: লেসনস ফ্রম কভিড-১৯, ওয়াটার জেন্ডার অ্যান্ড কভিড-১৯ নেক্সাস, রাইটস অব রিভারস এবং ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট গ্রাসরুটস ইনোভেশন অ্যান্ড সলিউশন এর ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্মেলন চলবে ২৯ জানুয়ারি প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০টা পর্যন্ত।