ছাত্রদলের কমিটিতে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ!

বরিশালে দেড় যুগ পর পুনর্গঠন করা ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের কমিটিতে ছাত্রলীগের মিছিলে অংশগ্রহণকারী, মাদকে সম্পৃক্ত, সন্ত্রাসী, বিবাহিত, অছাত্র, এক্স-রে অপারেটর এবং চাকরিজীবীদের পদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এদের অনেকে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নয় বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ গত এক যুগ ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত ও কারাবরণকারী এবং ছাত্রত্ব আছে এমন কর্মীদের ছাত্রদলে উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে। ত্যাগী কর্মীদের কমিটিতে মূল্যায়ন করা না হলে নতুন প্রজন্ম ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মহানগর ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির।

বিতর্কিতদের নিয়ে কমিটি করায় বরিশাল ছাত্রদলের কয়েকটি ইউনিট ঘোষিত ওই কমিটি বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনও করেছে। সরকারি ব্রজমোহন কলেজ এবং বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক কলেজ ছাত্রদলের পক্ষ থেকে পুনর্গঠিত কমিটিগুলো বাতিল করে ত্যাগী ও প্রকৃত ছাত্রদের নিয়ে কমিটি গঠনের দাবি তোলা হয়েছে।

অভিযোগ আছে, ছাত্রদলের কমিটিতে স্থান পেতে সর্বনিম্ন ২০০৫ সালে এসএসসি পাস, অবিবাহিত এবং সব শেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের প্রত্যয়নপত্রসহ জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়া অনেকের ক্ষেত্রে এই শর্ত পালন করা হয়নি।

বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের কর্মী জোবায়ের হোসেন জুয়েল জানান, গত ৭ জানুয়ারি বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। এ কমিটির সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল মিশন জেলা ছাত্রলীগের এক সহসভাপতির ঘনিষ্ঠ কর্মী। ওই নেতার সঙ্গে ছাত্রলীগের মিছিলে অংশ নেওয়ার ছবি রয়েছে মিশনের। এ কমিটির আহ্বায়ক ফয়সালুর রহমান ইমনের ছাত্রত্ব না থাকার পাশাপাশি পলিটেকনিক ছাত্রদলে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এছাড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ২১ সদস্যের ছাত্রদলের কমিটির ৯ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক শিফাত তালুকদার ক্যাম্পাসে ত্রাস সৃষ্টিকারী ছাত্রলীগ কর্মী বলে দাবি জোবায়েরের।

অন্যদিকে ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ ছাত্রদলের কমিটিতে মাজাহারুল ইসলাম বাবুকে আহ্বায়ক এবং সজল তালুকদারকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। বাবুর ছাত্রত্ব নেই এবং ছাত্রদলের কর্মসূচিতেও বিগত দিনে তাকে দেখা যায়নি। আহ্বায়ক পদ পেতে ছাত্রদলের ফরমের তথ্যও পূরণ করেননি তিনি। অথচ স্থানীয় দুই ছাত্রদল নেতার অনুসারী হওয়ায় ঢাকায় চাকরিরত এই বাবু পেয়েছেন বিএম কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক পদ। এ কমিটির ২১ সদস্যের ৫ জনই ছাত্রদলের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়।

সরকারি বরিশাল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম টিপু বিবাহিত এবং তার বিরুদ্ধে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। সন্ত্রাসী কর্মকা-ের কারণে স্থানীয়দের কাছে টিপু এক আতঙ্কের নাম। একইভাবে নগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের কমিটিতে জিয়াদ হাওলাদারকে আহ্বায়ক এবং এসএম আরাফাত রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। এসএম আরাফাত রহমান জানান, জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী জিয়াদের বয়স ১৫ বছর এবং তার শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক পাস। আরাফাত বিএম কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। বয়সে ও শিক্ষায় কম যোগ্যতাসম্পন্ন একজনের সঙ্গে রাজনীতি করতে আপত্তি আছে তার। পদের সুষম বণ্টন না হলে ছাত্রদলে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।

একাধিক ছাত্রদল কর্মীর অভিযোগ, নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবু তাহেরের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদকের চারটি মামলা। ৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্য সচিব মাহিন ইসলাম মারুফ দলে নিষ্ক্রিয়, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ছাত্রদলের আহ্বায়ক আশিক হাওলাদার রানার চেয়ে সদস্য সচিব তারেক রহমান সম্রাট পাঁচ ব্যাচ সিনিয়র। ৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক সুজন খানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। অথচ ওই ওয়ার্ডে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির অনেকে ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী ছিলেন।

১১ নম্বর ওয়ার্ডে ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়েছে আওয়ামী পরিবারের আজাদ সরদারকে (বাবা ওয়াহেদ সরকার পদ্মা ওয়েল কোম্পানির শ্রমিক লীগ নেতা)। ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে ছাত্রদলের আহ্বায়ক হয়েছেন ঢাকায় চাকরিরত অছাত্র তারিকুল ইসলাম সবুজ। ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়েছে অছাত্র নোমান হোসেনকে। ২৬ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়েছে বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক এবং অছাত্র নূরে আলমকে। ২৭ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক হয়েছেন বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক নগরীর সদর রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে অপারেটর পারভেজ হোসেন পাভেল।

ছাত্রলীগ কর্মী, মাদকে সম্পৃক্ত, সন্ত্রাসী, অছাত্র ও বিবাহিতদের ছাত্রদলে পদ দেওয়ার বিষয়ে মহানগর ছাত্রদল সভাপতি রেজাউল করিম রনি বলেন, ‘১৫-১৬ বছর পর মহানগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং কলেজ ছাত্রদলের কমিটি পুনর্গঠন হয়েছে। মহানগর ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সমন্বয় করে কমিটি দিয়েছে। প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে অনেকের রাগ-ক্ষোভ থাকতে পারে।’