১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে দলটি আসে তাদের অনেকেই নতুন। এই তরুণ দলটিকে উদ্দীপ্ত করতে ১৪ জানুয়ারি এগিয়ে এসেছিলেন ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ক্লাইভ লয়েড। খোলাচিঠিতে তরুণদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন। কীভাবে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেকে বিশ্বজয়ী দলের নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন তার বর্ণনা ছিল তাতে। তরুণদের উদ্দেশ্য করে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লয়েড লিখেছিলেন, ‘তোমাদের ভাবা উচিত জাতীয় দলে জায়গা পাকা করার মোক্ষম সুযোগ পেয়েছি, খালি জায়গা পূরণের নয়। বিশ্বের কাছে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ এটা তোমাদের এবং তোমাদের যে দ্বিতীয় সারির দল বলা হচ্ছে তা উড়িয়ে দেওয়ার উপলক্ষও।’
ক্লাইভ লয়েডের উদ্দীপনী সেই চিঠিতেই চট্টগ্রাম টেস্টে উইন্ডিজের রূপকথাতুল্য জয়ের নায়ক হয়ে গেলেন অভিষেকেই ২১০ করা কাইল মায়ার্স। ৪৫০ মিনিট উইকেটে থেকে ৩১০ বলে ২০ চার ও ৭ ছক্কার ইনিংস দিয়ে ঐতিহাসিক এক জয় এনে দিলেন ২৮ বছরের এই বার্বাডিয়ান।
নিউজিল্যান্ড সফরেও দলের সঙ্গে ছিলেন মায়ার্স। টেস্টে সুযোগ পাননি ড্যারেন ব্রাভো, রোস্টন চেজ, জেসন হোল্ডাররা দলে থাকায়। ওই সফরের ১০ জন আসেননি বাংলাদেশে। ওরা এলে হয়তো এবারও সুযোগ পেতেন না মায়ার্স। তখন টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচজয়ী ইনিংসও দেখা হতো না। চট্টগ্রাম হয়ে গেল ইতিহাসের সাক্ষী। এই ইতিহাস গড়লেন বার্বাডোজে জন্ম নেওয়া মায়ার্স। উইন্ডিজ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলে জাতীয় দলে আসা মায়ার্স এই ম্যাচের আগে ফার্স্ট ক্লাসের ৩৩ ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন মাত্র ২টি। গড় ২৯। ৫৯টি লিস্ট এ ম্যাচে করেছেন একটি সেঞ্চুরি। ফার্স্ট ক্লাস ও লিস্ট এ মিলিয়ে ৯২ ম্যাচে তিনটি সেঞ্চুরির মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪০। ২০১৫ সালে ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ার শুরু করলেও ২০১৯-২০ মৌসুমে এসে নিজেকে পান মায়ার্স। ওই মৌসুমেই ফার্স্ট ক্লাসে দুটি ও লিস্ট এ তে একটি সেঞ্চুরি করেন। ওই মৌসুমে লম্বা দৈর্ঘ্যরে ক্রিকেটে ৫০.৩০ গড়ে ৬৫৪ রান করেন এই অলরাউন্ডার। এই ফর্মের পুরস্কার পান গত বছর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে প্রথম জাতীয় দলে ডাক পেয়ে। ২ টি-টোয়েন্টি খেলে বাংলাদেশ সফরের দলে সুযোগ পান। খেলেছেন ৩ ওয়ানডেতেই। দলের পক্ষে ক্রুমা বোনারের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫১ রান করেন। এরপর টেস্টেও সেরা একাদশে সুযোগ পেলেন। প্রথম ইনিংসে ৪০ করেছিলেন আর সেরাটা দিলেন দলের সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে।
বাংলাদেশের বিপক্ষে গতকালের ইনিংসে অভিষেকে ডাবল সেঞ্চুরি করা ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হয়েছেন মায়ার্স। আর উইন্ডিজের হয়ে লরেন্স রো এর পর দ্বিতীয়। তবে ইতিহাসে ডাবল সেঞ্চুরিতে টেস্ট জেতানো দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হয়েছেন। এ তালিকায় তার আগে একজন ক্যারিবিয়ান-ই। গর্ডন গ্রিনিজ ১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ২১৪ করে উইন্ডিজকে জেতান। মায়ার্স অপরাজিত থাকলেন ২১০ রান। এছাড়া চতুর্থ ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডও মায়ার্সের। ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৫০ বা তার বেশি করা ব্রায়ান লারা পর একমাত্র উইন্ডিজ ব্যাটসম্যান হিসেবে এই ইনিংস দিয়ে দল জেতালেন। ব্রিজটাউনে সেদিন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেন ক্রিকেটের বরপুত্র লারা। এছাড়া পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৯৯ এ অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ১৪৯*, ২০০৮ এ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রায়েম স্মিথের ১৫৪*, ২০১০ এ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভিভিএস লক্ষণের ৭৩* ও ২০১৯ এ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বেন স্টোকসের ১৩৫* আধুনিক ক্রিকেটে স্মরণীয় ম্যাচজয়ী ইনিংস। তবে মায়ার্স তাদের সবাইকে পেছনে ফেললেন টার্গেটের বিশালত্বের দিক দিয়ে।
ম্যাচ শেষে মায়ার্স জানালেন, ‘অবশ্যই এমন উইকেটে ব্যাট করা সবসময়ই চ্যালেঞ্জের। ওরা পুরোদিনই ভালো বল করেছে। আমাদের যতটা সম্ভব উইকেটে পড়ে থাকতে হয়েছিল। আমরা পুরো দিনই রান করার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। সত্যি বলতে আজ উইকেটে ব্যাটিং করা সহজ ছিল না। কিছু বল নিচু হচ্ছিল, কিছু বল ধীরে আসছিল আবার কিছু বল স্পিন করছিল বেশি। মাঝে মাঝে ওরা আর্মবলও দিচ্ছিল, আমি শুধু উইকেটে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, যতটা সম্ভব সোজা ব্যাট খেলার চেষ্টা করেছি আর সেরাটা পাওয়ার আশা করেছি।’
সবশেষে জানালেন এই ইনিংসে আজীবন মনে রাখবেন। এটা তার ক্যারিয়ারের বিশেষ ইনিংস। সবসময়ই এই ডাবল সেঞ্চুরিকে এক নম্বরে রাখবেন, ‘এটা আমার কাছে অনেক স্পেশাল। আমার ক্যারিয়ার সেরা স্কোর। আবার এটা আমার প্রথম টেস্টও। তাই এই ইনিংসটা আমার কাছে অনেক স্পেশাল। ফার্স্ট ক্লাসে আমার কিছু সেঞ্চুরি আছে। কিন্তু এই ইনিংসে আমি ক্যারিয়ারে সবচেয়ে লম্বা সময় ব্যাট করলাম। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে হলো প্রথম টেস্টেই ডাবল সেঞ্চুরি করা। আমি সবসময়ই এটাকে মনে রাখব এবং শীর্ষে রাখব।’ বিশেষ ইনিংসটাকে মায়ার্স উৎসর্গ করেছেন পরিবার-বন্ধুবান্ধব ও কোচদের।